ফিচার

পশুর সাথে কোরবানী হোক মনের পশুত্বের

সুলায়মান আল মাহমুদঃ ঈদুল আযহা ইসলাম ধর্মাবলম্বিদের সবচেয়ে বড় দু’টো ধর্মীয় উৎসবের একটি। বাংলাদেশে এই উৎসবটি কুরবানির ঈদ এবং বকরা ঈদ নামেও পরিচিত। এ উৎসবের আনন্দ বিশ্বের সমগ্র মুসলিমের। সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহর আদেশে হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর আপন পুত্র ইসমাইলকে কুরবানি করার ঘটনাকে স্বরণ করে সারা বিশ্বের মুসলিম ধর্মাবলম্বীরা এই দিবসটি পালন করে। এ এক অনাবিল আনন্দ, যে আনন্দের কোনো তুলনা নেই। এ আনন্দ আল্লাহর নৈকট্য লাভের আনন্দ। এ আনন্দ গুনাহ মাফের এবং বৈষয়িক ব্যস্ততাকে বাদ দিয়ে পরলৌকিক জগতের পাথেয় সংগ্রহ করার আনন্দ। এ আনন্দ গরিব-দুঃখীর সাথে একাত্ত¡ হওয়ার আনন্দ। এ আনন্দ পশু কোরবানীর সাথে সাথে মনের পশুকে পরাস্থ করার আনন্দ। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের জায়গা এখন দখলে নিতে চাচ্ছে লৌকিকতা। ব্যবসায়ীরা অৎ পেতে থাকেন কখন ঈদ আসবে। উদ্দেশ্য দুই পয়সা বেশি কামানো। তাই ঈদের মাসে বাজার থাকে চরম উত্তাপে। কোন প্রয়োজনীয় পণ্যই স্পর্শ করার সাধ্য থাকে না সাধারণ গরিব ও মধ্যবিত্তের। গরিবেরা ঈদ উৎসব পালন করে বাজারের উত্তাপ সহ্য করেই, আর ব্যবসায়ীরা দাঁত কেলিয়ে হাসেন বাড়তি আয়ের আনন্দে। সারা বছর ধর্মকর্মে মতি না থাকলেও বাজারের বড় গরু বেশী দামে কিনে আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে জানান দিই আমরা কত বড় মুত্তাকি। প্রতি বছর কোরবানীর ঈদে বড় বড় গরু ও উটের সাথে তাদের ক্রেতাদের ছবি প্রকাশিত হয় পত্র-পত্রিকায়। এলাকায় শোডাউন হয়। গরীবদের মাঝে কাপড় বিতরণের নামে নিজের অহমিকা প্রকাশে ব্যস্থ থাকেন অনেকে। পকেটে নতুন টাকা নিয়ে ঈদের ময়দানে যেতে হবে। হোক না সে টাকা অবৈধ। ঈদের ময়দানে লোক দেখানো কোলাকুলি আর সালাম বিনিময়। মাঝে মধ্যে গরিবদের কিছু পয়সা হাদিয়া। ঈদকে উপলক্ষ্য চলে পটকাবাজি আর আতশবাজি। চাঁদাবাজি তো আছেই। বাজারে বাজারে, অলিগলিতে তরুণ-তরুণীরা নেমে পড়বে ঈদ আনন্দে ধুমধাড়াক্কা গানের তালে। মোবাইলগুলো হঠাৎ সচল হয়ে যাবে। কে কার আগে প্রেমিকার কাছে ঈদবার্তা প্রেরণ করবে, চলে তার লড়াই। সারা বছর খোঁজ না রাখতে পারলেও ঈদের অছিলা করে কেউ কেউ স্বজনদের কাছে ফোন দেন। দায়সারা খোঁজখবরও নেন বটে! ঈদকে পুঁজি করে নানা ধরণের অনুষ্ঠানের পসরা নিয়ে পাঁচ-সাত দিন ঈদ উৎসব পালন করে জাতীয় টেলিভিশন সহ প্রাইভেট চ্যানেল যার মাঝে থাকে বিরক্তিকর বিজ্ঞাপন। মুসলমানের ঈদের সাথে টেলিভিশনে প্রচারিত ওইসব অনুষ্ঠানমালার সামঞ্জস্য খুঁজতে যাওয়া বাতুলতা। ঈদ উপলক্ষ্যে সিনেমা হলগুলোতে মুক্তি পাওয়া নতুন নতুন ছবিগুলোরও সেই একই অবস্থা। ঈদের আগেই প্রায় প্রতিটি পত্র পত্রিকা আলাদা আলাদা ম্যাগাজিন ছাপবে। আর অনেক পক্ষ পত্রিকার ভেতরেই বিশেষ ঈদ সংখ্যা ছাপাবে। তবে দুঃখের বিষয় ধর্মীয় উৎসব ঈদ উপলক্ষে প্রকাশিত এই সব ঈদ সংখ্যার কোনো কোনটির প্রচ্ছদে শোভা পাবে, অর্ধ উলঙ্গ নারীর ছবি কিংবা নানা ধরনের অশ্লীল দেহের কারু কার্য। ঈদ সংখায় প্রকাশিত লেখাগুলোর সাথে ঈদের তাৎপর্য নিয়ে কোন মৌলিক লেখা খুঁজে পাওয়া দুস্কর হবে। এভাবেই আধুনিকতা ও লৌকিকতার মাঝে হারিয়ে যায় আমাদের ধর্মীয় অনুশাসনের ঈদ আনন্দ। কালের গড্ডালিকা প্রবাহে হারিয়ে যাই আমরা। যে আনন্দের বারতা নিয়ে মুসলমানদের ঈদ আসে সে অন্তরালে ডুকরে কাঁদে। কোরবানীর ঈদেও শিক্ষাও থেকে যায় অন্তরালে। মনের পশুকে জবেহ করার পরিবর্তে আমরা হয়ে উঠি পশু হন্তারক।
অশান্তির প্রচন্ডতায় দগ্ধ হই আমরা। কিন্তু এটাতো ইসলামের শিক্ষা নয়। এই ঈদের মূল প্রতিপাদ্য বিষয হচ্ছে ত্যাগ করা। তাই আসুন আমরা ভোগে নয় ত্যাগের মহিমা কীর্ত্তন করি আর নিজের ভিতরের পশুকে জবেহ করে শুদ্ধ মানুষ হয়ে সৃষ্টিকর্তার মহিমা গাই।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

আরও দেখুন...

Close
Close