ফিচার

গর্ব যখন লজ্জার

আহমদ জারীর:
সামান্য কেশে রফিক সাহেব বলা শুরু করলেন,
“বাবলা, আমাদের সময়ের সেরা মেধাবীদের একজন। বয়সে আমার একদম সমান, কিন্তু স্কুলে এক বছর সিনিয়র।
কারণ আছে।
আমরা একই বিল্ডিং এর উপর-নিচে থাকতাম।একদিন দু’জনের বাবারা আমাদের স্কুলে ভর্তি করাতে নিয়ে গেলেন। হেড স্যার বাবলার বিদ্যা বুদ্ধিতে মুগ্ধ হয়ে বললেন,”তুইতো দেখি ছাত্র সমাজের চৌধুরী সাব,তোরে ডাইরেক্ট ক্লাশ টুতে দিলাম।”
আসলেই তার বংশ চৌধুরী ছিল।
তারপর আমার জ্ঞান বুদ্ধি পরীক্ষা করে তাঁর চোয়াল ঝুলে গেল, তিনি অবাক চোখে তাকিয়ে বললেন,”কী করতাম,কী করতাম,আমার স্কুলে তো ক্লাশ ওয়ানের নিচে কিছু নাই, তোরে কই যে ভর্তি করাই???”
তারপর তিতা করলার শরবত খাওয়া মুখ করে বললেন,
“যা, গোড়া থাইকা লাইগা থাক,চেয়ার টেবিলের মত লাইগা থাক…”
এভাবে বাবলা আমার এক বছরের সিনিয়র হয়ে গেলো।”
এই কিছুদিন হলো মিস্টার আব্দুর রফিকের বাড়িতে এসে উঠেছি।চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিবো এবার।নানা বললেন,
-ওখানে গিয়ে কই থাকবি?আর কারেই বা চিনোস?তারচে আমার এক বন্ধু থাকে চিটাগাং,তার বাড়িতেই ওঠ।খুব ভালো মানুষ।আজই ওর সাথে কথা বলব।রফিক কিন্তু মাহবুব চৌধুরীর বাল্যবন্ধু…”
শুনেই আমার জিহ্বা তালুতে লেগে যায় যায়।
বাপরে!! মুক্তিযোদ্ধা মাহবুব চৌধুরীর বন্ধু!
এঁর কাছ থেকে মাহবুব চৌধুরী সম্পর্কে ভালোই গল্প হবে তবে…
এসব ভাবতে ভাবতেই উনার বাড়িতে ওঠলাম।পরীক্ষার ব্যস্ততায় চার দিন গেল চলে ।আজ পরীক্ষা দিয়ে আসলাম।আজ নিয়ে আর দু’দিন থাকব এখানে।এই দু’দিনে শহরটা ঘুরে দেখতে হবে।বিকালে হঠাৎ বৈঠকখানায় ভদ্রলোককে পেয়ে সেই প্রসঙ্গ তুলি।বেশ খানিক ক্ষণ চুপ থেকে শুরু করলেন বলা,আর বলেই যাচ্ছেন,
-ভর্তি হলাম স্কুলে,ক্লাস করলে কি হবে প্রতি বছর অন্তর বিশেষ বিবেচনায়ও আমায় পরের ক্লাশে উঠিয়ে দিতে হেড স্যার বেশ আপত্তি করতেন।তার এক কথা,”এই কাইল্লা গাধাটারে গাধা কইলে গাধারেও অপমান করা হইব।”
শেষ মেশ যখন বিশেষ থেকে বিশেষতর বিবেচনায় আমায় পরের ক্লাসে দিতে রাজি হতেন তখন আবার রক্তজবার মতো চোখদুইটা টকটকে করে বাজখাঁই গলায় বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেয়া আওয়াজে বলে দিতেন,”এইবার আবার তোরে তুইলা দিলাম,একদম আঠার মতো লাইগা থাকবি পড়ার পিছনে,বুঝলি?নাইলে…”
আমার প্যান্ট প্রায় ভিজিয়ে কোনো মতে জান নিয়া বাহিরে আসতাম।আর বাবলা বেটা আমার চোখের সামনে দিয়া প্রত্যেক বছর টকাটক ফার্স্ট হয়ে পরের ক্লাসে ওঠত।
তখন সে মাত্র ক্লাশ নাইনে পড়তো আর আমি তখন এইটে।
তার বাবা সে আমলে ব্যাংকের জি এম।
বড় আদরের বড় ছেলে, ঘর ভর্তি জৌলুস,হাঁক দিলেই আর্দালি, দামি সাইকেল,নিজস্ব মারফি রেডিও।
ঢাকা যাবে, তার জন্য ট্রেনের আলাদা কেবিন,সব ব্যবস্থা করতেন তার অতি উচ্চ পদস্থ নানা ভাই।
আদরের বড় নাতি।
হঠাৎ করে যুদ্ধ শুরু হলো,আমাকে বলল যুদ্ধে যেতে,বললাম,”পাগল হইছোছ না কি?পাকিস্তানী মিলিটারির লগে তুই লড়বি?”
আমাকে ভীতুর ডিম বলে চলে গেল।
এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেই বাড়ি থেকে পালিয়ে গেল।ঘুমন্ত মায়ের বালিশের নিচে কাঁচা চিঠি।
একজন কিশোর কিই বা লিখবে???
সে লিখছে,
“আম্মা, গেলাম,ওরা মানুষ মারছে, মা শুধু মারছে, জবাব দেবার জন্য গেলাম,এখন যে সুর্য উঠে, তাঁর আলো বেঠিক, পরাধীন দেশে সুর্য ঠিক্ আলো দেয় না, আমি ঠিক আলোর জন্য গেলাম মা, মুঠো ভর্তি আলো নিয়ে ফিরবো, ঠিক আলো। আর না ফিরলে, স্বপ্নে কথা হবে আম্মা।”
তার পালানোর সংবাদ শুনে আব্বা আমার বাইরে বেরুনোর ওপর একশ চুয়াল্লিশ ধারা জারি করলেন।কিছুদিন থাকলাম বাড়িতে বন্দি,তারপর পাঠিয়ে দিলেন নানা বাড়ি,ওখানেও স্বাধীন না,যা লম্ফঝম্প সব ঘরের ভিতর,বাইরে বেরুনো নিষেধ।
তারপর থেকে বাবলার খবর নেই, শুধু মাঝে মাঝে শোনা যেত, এক কিশোর দলবল নিয়ে বিদ্যুত গতিতে দেখা দেন,”পশু” হত্যা করে গায়েব হয়ে যায়।
লোক মুখে সে তখন মীথ।
সন্ধ্যার পর পরই এলাকার পশুরা বাংকারে ঢুকে যেতো, বলা হতো, ছেলেটি মানুষ নয় জ্বিন, কখন আঘাত করবে সামরিক কৌশলের পাতায় তাঁর কোন ধারণা নেই।
যুদ্ধ শেষে তিনি ”সঠিক” সূর্যের আলো নিয়ে মায়ের কাছে ফিরেছিলেন।”
আমি তন্ময় হয়ে শুনছি বসে।এ যেন সিনেমার কাহিনীকেও হার মানায়।রফিক সাহেব বলেই যাচ্ছেন,
-যুদ্ধের পর থেকে আমার মাথা হেট হয়ে থাকতো।আমার মতো ছেলে যুদ্ধকরে এলো,আর আমি কুড়ে হয়ে থাকলাম!
এই কথা আমায় আজও পীড়া দেয়।কিন্তু জানো নাতি,আমাদের এই বাবলা বেটা,তোমাদের মাহবুব চৌধুরী সারা জীবন মাথা উচু করে চলেছে একজন গর্বিত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে।আর এখন যেন সে নিজেরে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দিতেই লজ্জায় মরে যায়। শুধু আফসোস করে বলে,”যুদ্ধের আগে আমার বড়ভাই গিয়েছিলো চাকরির আশায় করাচিতে,অসম্ভব রকম মেধাবী ছিল,কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানী হওয়ায় জানোয়ার গুলা তাকে বাদ দেয়। এসব বৈষম্যের মূলোৎপাটন করতেই গেছিলাম যুদ্ধে,আর আজ যারা টাকায় মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট কিনে কোটা পক্ষে গলা ফাটায়,মরে যেতে ইচ্ছে হয়…
মনে প্রশ্ন জাগে কেন যে যুদ্ধ করেছিলাম…??”

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close