সোনার বাংলাদেশ

চকবাজারে অগ্নিকান্ডে ৬৭ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু

নিমতলীর ভয়াবহ অগ্নিকা-ের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল চকবাজারের । নিমতলীতে ২০১০ সালের ৩ জুনের আগুনে ১২৪ জনের প্রাণহানির পর গত বুধবার চকবাজারের চুড়িহাট্টাতে এ পর্যন্ত আগুনে প্রাণহানি হয়েছে ৬৭ জনের।
জানা গেছে, গত বুধবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে কেমিক্যালবাহী একটি পিকআপের সিলিন্ডার বিস্ফোরণে এ অগ্নিকা-ের সূত্রপাত। আর রাস্তার পাশে থাকা ভবনের ভেতর প্লাস্টিকের দ্রব্য ও দাহ্য পদার্থ থাকায় তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। চারটি লাগোয়া অবকাঠামোর ভেতর দিয়ে আগুনের বিস্তার ঘটে।
ফায়ার সার্ভিসের ৩৭টি ইউনিট দীর্ঘ ১৪ ঘণ্টার চেষ্টায় সেই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে, কিন্তু ততক্ষণে চুড়িহাট্টা মোড় পরিণত হয় মৃত্যুপুরীতে। ঘটনাস্থল থেকে ৬৭ জনের পোড়া লাশ মর্গে পাঠান উদ্ধারকর্মীরা, নয়জনকে ভর্তি করা হয় হাসপাতালে।
নিহত ৬৭ জনের মধ্যে ৪৫ জনের মরদেহ শনাক্ত করার পর স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করেছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ।
অগ্নিকা-ে অর্ধশতাধিক আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ৯ বছর আগে পাশের নিমতলী এলাকায় কেমিক্যালের আগুনে মারা গিয়েছিল ১২৪ জন।
রাত ৩টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে এনে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আলী আহমেদ বলেন, কেমিক্যালের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। রাত ৩টা পর্যন্ত তারা ১০টি লাশ উদ্ধার করেন। এরপর সকালে তিনি বলেন, আরো ৫৭টি লাশ উদ্ধার হয়েছে। সব মিলিয়ে লাশের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৭। ঢাকা মেডিক্যালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ জানিয়েছেন, তারা ৬৭টি মরদেহ পেয়েছেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাতে চুড়িহাট্টা শাহি মসজিদের কাছে হাজী ওয়াহেদ ম্যানসনের সামনে পারফিউম কেমিক্যালের কৌটা ভর্তি দুটি পিকআপ দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ একটি পিকআপের কেমিক্যাল থেকে আগুন লেগে যায়। এরপর পিকআপের সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ঘটে বিকট শব্দে। এতে পিকআপটি শূন্যে উঠে যায়। আবার ধপাস করে নিচে পড়ে। এ সময় ওয়াহেদ ভবনের পাশেই হোটেল রাজমহলের সামনে রাখা গ্যাস সিলিন্ডার ও চুলায় আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এর পরপরই আগুন আশপাশে আরো সাতটি ভবনে ছড়িয়ে পড়ে। তখন ঘটনাস্থল পাঁচ রাস্তার মোড় দিয়ে সাধারণ মানুষ, প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল, মালটানা গাড়ি চলাচল করছিল। সেই সঙ্গে ওই এলাকাতেই একটি বিয়ের অনুষ্ঠান চলছিল। বরযাত্রীরাও ওই পথ ধরে কমিউনিটি সেন্টারে যাচ্ছিল। তখন সেখানে তীব্র যানজট। ঠিক সেই মুহূর্তেই এই ভয়াবহ অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শী রফিকুল ইসলামসহ আরো অন্তত ১৫ জন।
চকবাজারে অগ্নিকা-ে নিহত ও আহতদের প্রয়োজনীয় সহায়তা করতে সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এদিকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির প্রাথমিক প্রতিবেদনে অগ্নিকা-ের কারণ হিসেবে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের কথা বলা হয়েছে। সিলিন্ডারটি হোটেল কিংবা ভবনটির সামনে একটি গাড়ি থেকে বিস্ফোরিত হয়েছে। তবে কেমিক্যাল থেকে বিস্ফোরণ হওয়ার বিষয়টি কমিটি নাকচ করে দিয়েছে। অপরদিকে অগ্নিকা-ে নিহত শ্রমিকদের প্রত্যেকের পরিবারকে এক লাখ টাকা সহায়তা দিবে শ্রম মন্ত্রণালয়। আহতদের চিকিৎসার জন্য দেওয়া হবে ৫০ হাজার করে টাকা।
১৫ মিনিটেই সবাই মারা যায়: প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য অনুযায়ী, আগুন লাগার পর এত দ্রুত চারপাশে ছড়িয়ে পরে যে ঘটনাস্থলের আশপাশের সব ভবনে ও পাঁচ রাস্তার মোড়ে অনেক মানুষ আটকে যায়। আর আগুন ছড়িয়ে পড়ার মূল কারণ ছিল প্লাস্টিকের সরঞ্জাম, পারফিউম ও কেমিক্যাল। ভবন ও ঘটনাস্থল এতটাই ঘিঞ্জি যে আগুন লাগার পরপরই এসবে আগুন ধরে যায়। বের হওয়ার কোন পথই ছিল না কারোর। ঘটনার ৫ থেকে ৭ মিনিটের মধ্যে যারা প্রাণ নিয়ে কোন মতে বের হতে পেরেছেন তারা এখন হাসপাতালে ভর্তি। বাকিরা আর প্রাণে বাঁচতে পারেননি। অর্থাৎ ঘটনার ১৫ মিনিটের মধ্যেই তারা পুড়ে মারা যান বলে ফায়ার সার্ভিস, প্রত্যক্ষদর্শী ও ঘটনাস্থলে থাকা পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আগুনের সময় ভবনে আটকে পড়া ও পথচারীরা জীবন বাঁচাতে অনেক জোরে জোরে চিৎকার করছিলেন। এ সময় তারা যে যার মত ‘আগুন আগুন’, ‘মরে গেলাম’, ‘বাঁচাও বাঁচাও’ বলে চিৎকার করতে থাকেন। কিন্তু ততক্ষণে তাদের শরীরে আগুন ধরে যায়। দূর থেকে তাদেরকে পুড়তে দেখা যায়, কিন্তু কারো কিছু করার ছিল না। কারণ আগুন এতটই ভয়াবহ ছিল যে এগিয়ে গিয়ে কাউকে উদ্ধার করা তাৎক্ষণিকভাবে কারো পক্ষেই সম্ভব ছিল না। এরপর রাত ১১ টার দিকে ফায়ার সার্ভিস সেখানে পৌঁছানোর পরও তাদেরকে জীবিত উদ্ধার করা যায়নি। এ সময় সাতটি ভবনের অন্তত ৩০টি দোকানে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে একটি ফার্মেসিতে ছিলেন শাহাদত উল্লাহ (৩০), আনোয়ার হোসেন (৩২), নাসির উদ্দিন (৩১) ও আনোয়ার হোসেন (৪০) নামে চার বন্ধু। আগুন সড়কে ছড়িয়ে পড়লে তারা আর বের হতে পারেননি। দোকানের শাটার বন্ধ করে দেন। পরে তারা সবাই পুড়ে মারা যান বলে জানান প্রত্যক্ষদর্শী এই চার জনের বন্ধু বাবর ওরফে বাবু। বাবু বলেন, ‘প্রতিদিনই আমরা বন্ধু শাহাদতের ওষুধের দোকানে আড্ডা দিতাম। আমারও সেখানে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ততক্ষণে সেখানে গিয়ে পৌঁছাই নাই।’ শুধু এই চার বন্ধুই নন, আগুন ছড়িয়ে পড়লে তার পাশেই হযরত আনাস হোটেলের কয়েকজন, হোটেলের পাশে আরো একটি চার তলা ভবনের কয়েকজন পুড়ে মারা যান। এ সময় ওয়াহেদ ম্যানসনের সিঁড়িতে আটকে পড়া ২৪ জন বের হতে পারেননি।
সরেজমিনে ঘটনাস্থল ঘুরে দেখা গেছে, ছোট ছোট পারফিউমের কৌটা বিস্ফোরিত হয়ে ঘটনাস্থল পাঁচ রাস্তার সড়কজুড়ে পড়ে আছে। সেখানে পড়ে থাকতে দেখা যায় ভস্মীভূত হওয়া দুটি পিকআপ, দুটি প্রাইভেটকার, একটি অটোরিকশা, ছয়টি মোটরসাইকেলসহ, বাই সাইকেল, মালটানা ঠেলা গাড়ি, ১০টি ভ্যান-রিকশাসহ কেমিক্যালের বিভিন্ন সরঞ্জামের কৌটা। ফায়ার সার্ভিসসহ স্থানীয়রা মনে করছেন, কেমিক্যালের আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এসব সরঞ্জামে। এ কারণে আগুনের তীব্রতা বাড়তে থাকে এবং ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় পাঁচ রাস্তার মাঝখানে আটকে পড়া লোকজন আগুন টপকিয়ে বের হতে পারেনি। দ্রুত তাদের শরীরে আগুন লেগে যায়।
সরেজমিনে দেখা যায়, ওয়াহেদ ম্যানসন নামে চার তলা (বেজমেন্টসহ পাঁচ তলা) ভবনের পুরোটাই পুড়ে গেছে। এ সময় ভবনের নিচ তলায় থাকা দুটি প্লাস্টিক সরঞ্জামের দোকান, পারফিউম ও ওষুধের দোকানসহ ১৪টি দোকানের পুরোটাই পুড়ে গেছে। এসব দোকানের বেশিরভাগ ব্যবসায়ী আগুনে আটকে পড়েন। এই ভবনের দ্বিতীয় তলায় ছিল কেমিক্যাল ও প্লাস্টিকের গুদাম। এছাড়া এই ভবনের ওপরে ভবন মালিক হাজী ওয়াহেদ মিয়ার দুই ছেলে ও তাদের পরিবারের সদস্যরা থাকেন। ঘটনার সময় তারা ভবনে ছিলেন না, একারণে তারা বেঁচে যান বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। তবে এই ভবনে থাকা কিছু ভাড়াটিয়া ও ব্যবসায়ীদের অনেকে পুড়ে মারা গেছেন। এছাড়া এই ভবনের সামনে হাবিব টেইলার্স, হায়দার ফার্মেসি পুড়ে আরো ছয়জন মারা যান। এ সময় ওষুধের দোকানে আটকে পুড়ে মারা যান মোল্লা ওমর ফারুক নামে স্থানীয় বড় কাটরা মাদ্রাসার একজন শিক্ষক।
প্রত্যক্ষদর্শী মোস্তফা কামাল বলেন, আগুনের তীব্রতা এতটাই ছিল যে চুড়িহাট্টা মসজিদের বাইরের টাইলস খসে পড়ে। এ সময় অনেক মুসল্লিসহ এতিম অনেক শিশু-কিশোর মসজিদে আটকে পড়ে। তবে তাদের কোন ক্ষতি হয়নি। মসজিদে কেউ মারা যায়নি। তবে মসজিদের দেয়ালে টানানো ঘড়ির কাঁটা ১০ টা ৩২ মিনিটে গিয়ে থেমে যায়। এতে ধারণা করা হচ্ছে, আগুন ১০টা ৩০ থেকে ৩৫ মিনিটের মধ্যেই লেগেছিল।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মধ্যে আগুন লাগার পর সর্বোচ্চ ১৫ মিনিটের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময়ের মধ্যে বিভিন্ন ভবন ও সড়কে আটকে পড়া লোকজনের মধ্যে ৪৮ জন কমবেশি আহত ও অগ্নিদগ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা নেন। এর মধ্যে ৯ জন বর্তমানে চিকিৎসাধীন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, চকবাজারে অগ্নিকা-ের ঘটনায় নিহতদের বেশিরভাগই সড়কে চলাচলরত অবস্থায় এবং শাটার বন্ধ করে দেওয়া দোকান বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ভেতর আটকা পড়ে মারা যান।
আজিজুল ইসলাম নামে এক ফায়ারম্যান জানান, ‘আগুন লাগা ভবনটির নিচতলার মার্কেটের করিডরের শেষ মাথা থেকে একসঙ্গে ২৪টি লাশ উদ্ধার করি আমরা। দেখে মনে হয়েছে আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে তারা দৌড়ে গিয়ে সেখানে আশ্রয় নিয়েছিল। এছাড়া আশেপাশের দোকান ও রেস্টুরেন্ট থেকেও লাশ উদ্ধার করা হয়।’
প্রত্যক্ষদর্শী প্লাস্টিক ব্যবসায়ী পারভেজ জানান, ‘ওয়াহেদ ম্যানসনের নিচতলায় রানা টেলিকম, বিপরীতে হাবিব টেইলার্স, হায়দার ফার্মেসিসহ আশেপাশের সব দোকান সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শাটার বন্ধ করে দেয়। সবাই ভেবেছিল শাটার বন্ধ করে দিলে আগুন থেকে বাঁচতে পারবে। কিন্তু আগুনের তীব্রতা বাড়ার কারণে সেখানেই পুড়ে মারা যান তারা।’
আগুন নেভাতে বিমান বাহিনীর দু’টি হেলিকপ্টার দিয়ে পানি ছিটানো হয় বলে জানিয়েছেন এয়ার কমোডর মো. জাহিদ হোসেন। বুধবার রাতে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিমান বাহিনীর দুটি হেলিকপ্টার এনে আগুন নেভানোর চেষ্টা করা হয়। তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে ৩টা ৪৮ মিনিটে পানি নিয়ে হেলিকপ্টার দু’টি ঘটনাস্থলের দিকে রওনা দেয়। এরপর আকাশ থেকে পানি ছিটানো হয়।’
চকবাজারের চুড়িহাট্টায় অগ্নিকা-ের ঘটনাস্থলে উদ্ধার অভিযান গতকাল দুপুরে সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়। তবে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট ঘটনাস্থলে থাকবে। তারা ঘটনাস্থল দেখভাল করবে এবং সিটি করপোরেশনের কর্মীদের সঙ্গে মিলে আবর্জনার স্তূপ সরানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন এই ঘোষণা দেন।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close