ফিচার

কলামিস্ট জুবায়ের সিদ্দিকী‘কালের কথামালা’র আলোকে

আবদুল হামিদ মানিক: [অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা জুবায়ের সিদ্দিকী বর্তমানে শিক্ষাঙ্গনে সার্বক্ষণিক নিবেদিত ব্যক্তিত্ব। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জুবায়ের সিদ্দিকী অবসর গ্রহণের পর শুরু করেন লেখালেখি। লেখক, কলামিস্ট হিসেবেও তিনি নন্দিত হয়েছেন। পত্রপত্রিকায় তাঁর প্রচুর লেখা ছাপা হয়েছে। ২০০৮ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘কালের কথামালা’। বর্তমানে তিনি লেখালেখির অঙ্গনে প্রায় নীরব হলেও সাহিত্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি অঙ্গনে সরব। তাঁর দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘কালের কথামালা’র পাঠোত্তর আলোকপাত স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ২০০৮ সালে। এতে জুবায়ের সিদ্দিকীর লেখক সত্তার পরিচয় পাওয়া যায়। এই বিবেচনায় লেখাটি পরিবেশিত হল। – সম্পাদক ]

দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদ, উন্নতমানের কাগজ, লাগসই নামকরণ ও ঝলমলে ছাপায় বিচিত্র বিষয়সমৃদ্ধ ‘কালের কথামালা’ লেখক জুবায়ের সিদ্দিকীর দ্বিতীয় গ্রন্থ। প্রথম গ্রন্থ ‘স্মৃতির অলিন্দে’ ছিল ভিন্ন মেজাজের। সৈনিক জীবনের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতাপ্রধান ঐ প্রকাশনার পর ‘কালের কথামালা’ তাঁর লেখক পরিচিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একই সঙ্গে সময় সচেতন এক জন কলমসৈনিকের মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়েছেন কলামিস্ট জুবায়ের সিদ্দিকী। আমার বিশ্বাস সকল স্তরের পাঠক এ বইতে নানা প্রসঙ্গে চিন্তার খোরাক পাবেন।
‘কালের কথামালা’ লেখকের বিভিন্ন সময়ে লিখিত ও প্রকাশিত কলাম সংকলন। প্রবন্ধ, নিবন্ধ, ফিচার কলাম প্রভৃতির পার্থক্যরেখা শাস্ত্রীয় মাপকাঠিতে টানা যায়। তবে শাস্ত্রীয় সংজ্ঞা ও মাপকাঠির প-িতী শাসন এখন শিথিল। প্রবন্ধ, উপসম্পাদকীয় কিংবা প্রাবন্ধিক নিবন্ধকার ইত্যাদি বিশেষ্য বিশেষণ ছাপিয়ে আজকাল কলামিস্ট শব্দটিই বেশি ব্যবহৃত এবং জনপ্রিয়। নব্বই দশকে দেশে সংবাদপত্রের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়। বেরিয়ে আসেন বিপুল সংখ্যক সংবাদপত্রীয় নিবন্ধ লেখক বা কলামিস্ট। স্বনামে প্রতিটি সংবাদপত্রে প্রচুর কলাম প্রকাশের ধারা শুরু হয়। আগেও কলাম ছিল। বেশির ভাগই সম্পাদকীয় পাতায় ছদ্মনামে প্রকাশিত হতো। মুসাফিরের কলাম লিখতেন তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। ‘স্পষ্টভাষী’ নামে খন্দকার আব্দুল হামিদ ‘লুব্ধক’ নামে আখতার উল আলম ‘গাছ পাথর’ নামে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ‘মৈনাক’ নামে, কবি শামসুর রহমান, ‘অনিকেত’ নামে আহমেদ হুমায়ূন সহ অনেকের কলাম ছিল বহুলপঠিত। এসব লেখকের মধ্যে মানিক মিয়াসহ প্রবীণ দু এক জনের কলাম বই আকারে বেরিয়েছে। ফরহাদ মাজহারের ‘ক্ষমতার বিকার ও গণশক্তির উদ্বোধন’ নামক বই এই ধারায় সাম্প্রতিক সংযোজন।
পাঠকের প্রতিদিনের প্রাথমিক চাহিদা মেটায় সংবাদ বা খবর। এর বাইরেও পাঠক সমাজের চাহিদা ও জিজ্ঞাসা থাকে। বাড়তি এই চাহিদার যোগান দেয় কলাম। সমসাময়িক ঘটনাবলীর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণনির্ভর কলাম পাঠককে সমকালের সঙ্গে নতুন মাত্রায় যুক্ত করে দেয়। জনমত গঠনে এর বিপুল প্রভাব আছে। তবু অনেকে মনে করেন, সমকালের সাময়িক চাহিদা পূরণ করে কলাম নিঃশেষ হয়ে যায়। আসলে এ দৃষ্টিভঙ্গি সঠিক নয়। আজকের ঘটনা ও চিন্তা প্রবাহ আগামী দিনের ইতিহাস। তাই কলামগুলো বই আকারে সংরক্ষিত হলে চলমান সময় জীবন্ত রূপরস নিয়ে অবিকৃত থাকে। কলামিস্ট জুবায়ের সিদ্দিকী লেখকের কথায় বলেছেন: অনেক অনেক বছর পর যারা দেশ বিদেশে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে কৌতুহলী হবেন, ইতিহাস নিয়ে নাড়াচাড়া করবেন, তাদের কাছে হয়তো কালের কথামালা কিছুটা হলেও আগ্রহের সৃষ্টি করবে।’ এ বক্তব্যের সঙ্গে কারো দ্বিমতের অবকাশ নেই। আবার এটিও বলা যায় যে, এই পরিবর্তনশীলতা বা বিবর্তনকে ধরে রাখার জন্যই কলাম গ্রন্থ পৃথক গুরুত্ব বহন করে।
কালের কথামালা ৬৩টি নিবন্ধের সংকলন। নানা বিষয়ে লেখক নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে আলোকপাত করেছেন। বুদ্ধিবৃত্তি ও অভিজ্ঞতা ভিত্তিক ২০০১-২০০৭ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় এগুলো প্রকাশিত। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ করেছেন তবে বুদ্ধিবৃত্তির মারপ্যাচ ও ভাষার কারুকাজে পাঠককে জব্দ করার চেষ্টা করেননি। সহজ সরল বিন¤্র ভঙ্গিতে নিজের বক্তব্য, মন্তব্য ও পর্যালোচনা পেশ করেছেন। চেনাজানা তথ্য উপাত্ত এবং ব্যক্তিগত উপলব্ধিই জুবায়ের সিদ্দিকীর লেখালেখির প্রধান উপকরণ। এ জন্যই গ্রন্থটি সকল স্তরের পাঠকের কাছে সহজবোধ্য ও সুখপাঠ্য হবে।
কালের কথামালায় আছে বিচিত্র বিষয় ভাবনা। শিক্ষা, প্রযুক্তি বিজ্ঞান, রাজনীতি, অর্থনীতি, আইন শৃংখলা, সন্ত্রাস, দুর্ভোগ, বিপর্যয়, দুর্নীতি, রাজনৈতিক সংস্কারসহ জাতীয় নানা সমস্যা সম্ভাবনা প্রসঙ্গ বইতে এসেছে। ট্রুথ কমিশন, অপারেশন ক্লিনহার্ট, ১/১১ পরবর্তী সরকার ইত্যাদি জাতীয় ইস্যুর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিষয়েও লেখক আলোকপাত করেছেন। ইরাক, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ইসরাইল, বিশ্বায়ন, সা¤্রাজ্যবাদী আগ্রাসন, প্রভৃতি বিষয়ে আবেগমুক্ত মতামত ব্যক্ত করেছেন লেখক। এই বিষয় বৈচিত্র পাঠকের জন্য নিঃসন্দেহে সুখকর। রাজনৈতিক বিষয়ে লেখক সংকীর্ণ দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি লালন করেননি। আসলে ম্ক্তুবুদ্ধির দাবী অক্ষুন্ন রেখেই তিনি লিখেছেন এবং লিখছেন। নির্দিষ্ট রাজনৈতিক চেতনা শাসিত কলামের ভীড়ে মুক্তবুদ্ধির ফসল হিসেবে কালের কথামালাকে চিহ্নিত করা যায়।
একজন কলাম লেখকের কাজ প্রচ- শ্রমনির্ভর। মেধা, সৃজনশীল ক্ষমতা, প্রখর দৃষ্টি এবং সমকালীন ঘটনা প্রবাহের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংযোগ ছাড়া কলাম লেখা যায়না। এগুলো তাৎক্ষণিক এবং সাময়িক প্রয়োজনে লিখিত হলেও প্রভাব সুদূরপ্রসারী। ভারী প্রবন্ধের চাইতে তুলনামূলক হালকা কলাম জনমত গঠন ও পরিবর্তনে দ্রুত ক্রিয়াশীল। মানুষকে শারিরীকভাবে মোকাবেলা করা সহজ। আইন প্রয়োগ করে মানুষকে নিয়ন্ত্রন করা যায়। কিন্তু এর সীমাবদ্ধতা আছে। আইন এবং শক্তি বাইরের আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে। অথচ মানুষ পরিচালিত হয় তার ভেতরের অর্থাৎ বিবেকের শাসনে। সেই বিবেককে নিশানা করে মানুষের আত্মাকে শব্দের কামান দিয়ে জয় করেন লেখক। এ মহৎ কাজে নিয়োজিত জুবায়ের সিদ্দিকীর সাফল্য আমরা কামনা করি। তিনি সৈনিক ছিলেন, এখনো কলমসৈনিকের ভূমিকায় আছেন। তাঁর সুচেতনার জয় হোক।
কালের কথামালার সুদৃশ্য প্রচ্ছদ করেছেন হামিদুল ইসলাম, প্রকাশক সৌরভ প্রকাশনী, মুদ্রণ প্রমাদমুক্ত, ২৩২ পৃষ্ঠার বইটির প্রকাশকাল জুন ২০০৮, মূল্য ২০০ টাকা।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close