ফিচার

বাংলা সাহিত্যের কবি আল মাহমুদ

মোহাম্মদ আব্দুল হক: বাংলাভাষায় যারা দরদী এবং যারা সাহিত্য প্রেমিক তারা বাংলা সাহিত্যে বিচরণ করে থাকেন মনের তাগিদে ভাষা ও মাটির টানে। এমন সাহিত্যিক আছেন আমাদের বাংলাদেশে অনেকে। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ জায়গা করে নিয়েছেন সারা বাংলাদেশের মানুষের মনের গহীন গহ্বরে। এমন একজন হচ্ছেন আল মাহমুদ। তিনি বাংলা সাহিত্যে ভালোভাবে বিচরণ করেছেন। সাহিত্যের নানান শাখায় তাঁর অবদানের জন্যে তিনি সম্মান পেয়েছেন তাঁর জীবদ্দশায়। তবে তিনি কবিতার জন্যে মানুষের মনের মাঝে জায়গা করে নিয়েছেন। তাই বাংলা সাহিত্যের আল মাহমুদ বললে কবি আল মাহমুদ চোখের সামনে চলে আসেন তাঁর ‘সোনালী কাবিন’, ‘নোলক ‘, ‘ একুশের কবিতা ‘ ইত্যাদি কবিতা নিয়ে। আজ আমি কবি আল মাহমুদ নিয়ে লিখতে কলম ধরেছি। অথচ সেই ছোটো বেলায় যখন স্কুলের কোনো শ্রেণির বাংলা বইয়ের পাতা উল্টিয়ে পড়েছি, ” নারকেলের ওই লম্বা মাথায় হঠাৎ দেখি কাল / ডাবের মতো চাঁদ উঠেছে ঠান্ডা গোলগাল।” তখন কবিতার কি মানে হয় কিছুই বুঝতাম না। এখনো কি বুঝি কবিতা কি? বুঝিনা কবিতা কি। তবে এটুকু বুঝি, কবিতা হলো কবিতা যা কবি লিখে থাকেন। আর কবিতা লিখেন যিনি তাঁকে কবি বলা হয়। তবে কবি যে অনেক বড়োমানুষ সেটা ছোটো বেলায় ঠিক বুঝতাম। তাইতো কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ফররুখ আহমদ, আল মাহমুদ এমন কবিদের নাম সেই ছোটোবেলা যেমন মনে মনে এবং জুড়ে জুড়ে উচ্চারণ করেছিলাম এখনও ঠিক আগের মতোই মনে আছে। ইহারা আমাদের ভালোবাসার মানুষ। আর ভালোবাসার মানুষকে কেউ ভুলতে পারেনা, আমিও ভুলতে পারিনি।

অনেকে বলেন বিভিন্ন বক্তৃতায় আবার অনেকে লিখেন বাংলা সাহিত্যে নাকি বন্ধ্যা দশা এখনো চলছে। আমি তা মানতে পারিনা। আমার মনে হয় বাংলা সাহিত্য এখন অনেক সমৃদ্ধ। সাহিত্য সমৃদ্ধ কেন বলবোনা, আমাদের কবি সাহিত্যিক যাঁরা তাঁরা সমাজের বোধশক্তি সম্পন্ন মানুষের কাছে শ্রদ্ধাভাজন। এটা আমরা মানি। কারণ কবি সাহিত্যিকগণ বিভিন্ন সভায় সম্মানিত জন। এবং তাঁরাই এদেশে সম্মাননা পেয়েও থাকেন। ভুলে গেলে চলবেনা আমাদের আছে বাংলা একাডেমি। প্রতি বছর আমাদের কবি সাহিত্যিকদের সাহিত্যের নানান শাখায় অবদানের জন্যে পুরস্কার দেওয়া হয়। এছাড়াও এক অতি সম্মানজনক পুরস্কার হলো একুশে পদক যা আমাদের সাহিত্যাঙ্গণের গুণিজনকে দেয়া হয়। আরও বিভিন্ন নামে বিভিন্ন পুরস্কার সারা দেশের সাহিত্য প্রেমিকগণ সাহিত্যে অবদানের জন্যে সাহিত্যিকদেরকে দিয়ে সম্মানিত করেন। তবে দুষ্ট লোক সাহিত্যের মর্ম বুঝতে চায়না। তাই দুষ্টলোকের কথা এখানে আনছিনা। শুধু বলবো, পদ্য ও গদ্য সাহিত্যের বই যে শুভ্র আলোকের খুঁজ দিতে পারে তাতে ওই মূর্খ গোঁয়ার প্রকৃতির লোকদের বোধোদয় ঘটুক।

কবি আল মাহমুদ বাংলা সাহিত্যে একজনই। তিনি হঠাৎ এসে বিজয় ছিনিয়ে নেননি। অথবা এসেই তিনি আমাদের মনে জায়গা করে নেননি। বরং তিনি ধীরে ধীরে কবিতার রাজ্যে জায়গা করে নিয়েছেন এবং তাঁর কবিতা আমাদেরকে পড়িয়ে আমাদের মনের মানুষ হয়েছেন। কারণ কবি আল মাহমুদ তাঁর কবিতার ভিতরে আমাদের মনের কথা বলেছেন আর তাই আমরা তাঁকে চিনতে পেরেছি এবং তিনি হয়ে উঠেছেন আমাদের কবি। কবি আল মাহমুদ বাংলাদেশের মানুষের প্রিয় কবি। হ্যাঁ, আমরা জানি নজরুল ও রবীন্দ্রনাথ এসেই চমক সৃষ্টি করে জয় করেছেন। কিন্তু কবি আল মাহমুদ পথে হাঁটতে হাঁটতে নিজের পথকে করেছেন আমাদের জন্যে অনুসরণীয়।

কবি আল মাহমুদ তাঁর সৃষ্টিতে ধন্য। ১৯৬৮ খ্রিষ্টিয় সালে যখন বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি অর্থাৎ এই ভূখণ্ডের পাকিস্তান আমলে তিনি তাঁর লোক লোকান্তর ও কালের কলস এর জন্যে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পান। তখন থেকেই কবির পথ স্পষ্ট হতে থাকে। তবে ১৯৭৩ খ্রিষ্টিয় সালে যখন তাঁর ‘সোনালি কাবিন ‘ প্রকাশিত হয়, তারপর থেকে তাঁর কাব্য খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র সর্বজনে। বলা যায় সেই থেকে তিনি হয়ে উঠেন সোনালি কাবিনের কবি। সোনালি কাবিন কবি আল মাহমুদ কে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের উচ্চতম আসনে বসিয়েছে। এ কারো দয়ার দান নয়। আগেই বলেছি কবি আল মাহমুদ ধীরে ধীরে তাঁর পথকে তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন সৃষ্টিশীলতার প্রতি তাঁরই গভীর প্রেমানুভূতি দ্বারা। শুধু তাঁর সোনালি কাবিন নিয়ে এক সুদীর্ঘ লেখা উপস্থাপন করা সম্ভব আধুনিক বাংলা কবিতার সমজদার যারা তাদের পক্ষে।

সাহিত্যের নানান শাখায় অর্থাৎ কবিতা, ছোটো গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস ইত্যাদি তিনি লিখেছেন। তিনি ছিলেন একজন সাংবাদিক। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরে ‘দৈনিক গণকণ্ঠ ‘ নামের একটি পত্রিকার তিনি সম্পাদক ছিলেন (১৯৭২-১৯৭৪)। কবি আল মাহমুদ একজন মুক্তিযোদ্ধা। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন সৈনিক। প্রকৃত সত্য হলো যিনি কবি তিনি স্বপ্ন দেখেন এবং মানুষকে স্বপ্ন দেখান সুন্দর পথের আবার কেউ কেউ পথ রচনা করেন। সংক্ষিপ্ত আকারের এই লেখায় শুধু বলছি, জাতি এই কবিকে অনেক অনেক বেশি দিলেও শোধ হবেনা। বরং যেদিন মানুষের মনের গহীন থেকে হাসি আসবে সেদিনই কবির স্বপ্ন পূরণ হবে। বাঙালি জাতি কবিকে অসম্মান করেনি। আমরা জানি কবি আল মাহমুদ শুধু বাংলা একাডেমি পুরস্কারই নয়। তিনি ১৯৮৬ খ্রিষ্টিয় সালে একুশে পদক পেয়েছেন। ১৯৭২ খ্রিষ্টিয় সালে জয়বাংলা পুরস্কার ও জীবনানন্দ স্মৃতি পুরস্কার পেয়েছেন। তবে তাঁর সবচেয়ে বড়ো পুরস্কার হলো, আমি দেখেছি ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ এ তাঁর মৃত্যুতে তাঁকে নতুন করে খুঁজতে শুরু করেছে এই প্রজন্মের শিক্ষিত সমাজ। কবি আল মাহমুদ উচ্চারিত হবেন কবিতার মঞ্চে যুগে যুগে।
লেখক  কলামিস্ট কবি ও প্রাবন্ধিক

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

আরও দেখুন...

Close
Close