ফিচার

হ্যামেলিনের বাঁশিওয়ালা

সুজিত রঞ্জন দেব: যেন হঠাৎ ক’রেই উদয় হল গুহাটা-অবারিত তার প্রবেশদ্বার।বিস্ময়কর এবং বিস্তৃত-সামনে এগিয়ে গেলো বাঁশিওয়ালা;…তাকে অনুসরণ করল শিশুর দল।-রবার্ট ব্রাউনিংদ্য পাইড পাইপার অব হ্যামেলিন (১৮৪২)——————————————–

গল্পটা ঘিরে স্মৃতিটা একই সাথে বেদনা জাগানিয়া আবার মধুরও।বেদনার কারণ আমাদের সময় ফাইভের সিলেবাসে ছিল গল্পটা।ষাণ্মাসিক পরীক্ষার প্রশ্ন, বাঁশিওয়ালা কতটা স্বর্ণমুদ্রা চেয়েছিল?উত্তরে লিখেছিলাম-পাঁচ শত। (হওয়া উচিৎ ছিল এক হাজার)এমন গর্হিত অপরাধের জন্য দিদিমণির মলে দেয়া কানের ব্যথাটা আজও অনুভব করি।মধুর, কারণ-ওই কানমলার পেছনে তাঁর এবং তাঁদের যে হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা আমরা টের পেয়েছিলাম-সেই একই কাজ এখন করতে গেলে…ঠিক জানা নেই তবে ‘শারীরিক নির্যাতন’ হেতু নালিশ, পত্রিকায় বোল্ড হেডলাইন, সাংবাদিক সম্মেলন…ইত্যাদি ইত্যাদি তো অবধারিতই; সাথে ছয়মাস থেকে দুইবছরের জেল-জরিমানা…(শিক্ষকদের অন্তরের সাথে আমাদের আগামী প্রজন্মের বাচ্চাদের দূরত্ব চিন্তা করে আফসোস হয় বৈকি!)অনার্সের শুরু থেকে টানা ২০১৪ পর্যন্ত কমবেশি ২০ বছর-যখন বাসায় বাসায় কলিংবেল টিপতে হতো-আশ্চর্যের (আবার মজারও) ব্যাপার হল-বায়োলজি নয়; বেশীরভাগ বাসায়ই ইংরেজি আর কেমিস্ট্রি পড়াতে হতো!যদি ভুল না করে থাকি-Chowdhury And Hussain এর Advance Learners’ English Second Paper বইটার ২৮৩ পৃষ্ঠার (২০০০/২০০১ সংস্করণ) একটা narration ছিল অনেকটা এরকম:‘How Much Do You Want For The Job?’, Asked The Mayor.: One Thousand Gold Coins,’ Replied The Piper….(পরবর্তীকালে সম্ভবত জার্মান গল্পকার কিংবা ইংরেজ কবিদের ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়-এখানে তথ্যগত একটা ভুল ছিল। যেসময়ের গল্প কিংবা কাহিনীটা যে এলাকার-ঐতিহাসিকরা বলেন, সে সময়ে ওই এলাকায় স্বর্ণমুদ্রার প্রচলন ছিল না। বরং ওখানকার মুদ্রা হিসেবে ফ্লোরিনের (florins) প্রচলন ছিল (১ ফ্লোরিন=৪৬ টাকা)।সেক্ষেত্রে Narratinoটা উচিৎ এরকমঃ:‘How Much Do You Want For The Job?’, Asked The Mayor.: One Thousand Florins,’ Replied The Piper….পাঠক,অনেক ভূমিকা হল।এবার আসুন যে গল্প নিয়ে এতো এতো গল্পের বাহানা, সেদিকে যাওয়া যাক।তবে অবশ্যই আমার মতো ক’রে!…বহুকাল আগের কথা।তখনো জার্মানির বিখ্যাত ‘তিরিশ বছরের যুদ্ধের (Thirty Years’ War) বাকি ৩৫০ বছর (জুন ১৬৩৪) সুইস জেনারেল নিফাউসেনের কাছে অল্ডেন্ডরফটো’র যুদ্ধে তখনো পরাজিত হন নি লুথার ডিয়েট্রিখ। নেপোলিয়ন বোনাপার্টের কাছে জেনা-অয়ের্স্টার বিনাযুদ্ধে অসহায় আত্মসমর্পণের বাকি আরও ৫২৪ বছর (সাল ১৮০৮)…এ গল্প তখনকার।দেশের নাম জার্মানি।শহরের নাম হ্যামেলিন। জার্মানরা বলেন হামেলন।আজকের বার্লিন থেকে ট্যাক্সিতে হাইওয়ে-টেন (10) ধরে উত্তর দিকে ম্যাগডেবার্গ হয়ে হ্যানোভার, সেখান থেকে প্রায় হল্যান্ডের বর্ডার ছুঁয়ে হ্যামেলিন-কমবেশি ৫০০ কিলোমিটার। হ্যামেলিন থেকে অল্প একটু সামনে গেলেই বিখ্যাত ফুটবল টীমের শহর ডার্টমুন্ড।আজকের মতো হ্যামেলিন-পিরমন্টের জেলা শহর হিসেবে তখনো স্বীকৃতি পায়নি জায়গাটা। ৮৫১ সালের শুরুর দিকে হ্যামেলিনের উত্থান লোয়ার-সাক্সোনির ছোট্ট একটা মঠ কিংবা আশ্রম হিসেবেই। তারপর আস্তে আস্তে আশ্রমকে ঘিরে গড়ে উঠতে থাকে ছোট্ট একটা লোকালয়। ১২’শ শতাব্দীর গোঁড়ার দিকে মোটামুটি একটা শহরের আকৃতি পায় হ্যামেলিন।আর দশটা গ্রামের মতই সাধারণ। পাশ দিয়ে বয়ে চলা ওয়েজার নদী, সামান্য দূরের বিশাল পাহাড় আর গ্রামকে বেষ্টন করে রাখা চমৎকার সবুজ বনানীকে কেন্দ্র ক’রে গড়ে উঠা সমুদ্র সমতল থেকে প্রায় ২২৩ ফুট উপরের কমবেশি ১৩০০ লোকের এ জনবসতির সবাই সহজসরল গ্রাম্য মানুষ। আচার ব্যবহারে সজ্জন ও দয়ালু। উজ্জ্বল বাহারি রঙ নিয়ে ঘরবাড়িগুলো আক্ষরিক অর্থেই ছবির মতো। পাথরের তৈরি ঝকঝকে পরিষ্কার মসৃণ রাস্তায় পা পিছলে যেতে পারে যে কারো।এহেন হ্যামেলিন বাসীর জন্যও একদিন সমস্যা দেখা দিলো।আলস্য আর নিজেদের অজ্ঞতা হেতু স্বাভাবিক পরিচ্ছন্নতার নিয়ম মানত না তারা। ডাস্টবিন না থাকায় শহরের যেখানে সেখানে পড়ে থাকতো খাবারদাবারের অবশিষ্ট অংশ।ফলাফল?ইঁদুর!…যেন হঠাৎ করেই একদিন ওরা আবিষ্কার করল-ইদুরে ভরে গেছে তাদের ছোট্ট সুন্দর শহরটা। প্রথমেই আক্রান্ত হল শস্যাগার আর গুদামঘরগুলো। যেন অল্পদিনেই সংখ্যায় বাড়তে লাগলো ছোট, বড়, মাঝারি মূষিকের দল…ওয়ারড্রোবের ড্রয়ার, টেবিলের তলা, চুলা, চায়ের কাপ…হেন কোন জায়গা নেই যেখানে দেখা মিলল না ওদের। আকারে এত বড় আর সংখ্যায় এত বেশী যে, ওদের দেখে ভয়ে পালিয়ে যেতে লাগলো বিড়ালের দল। একসময় দেখা গেলো কেবল ধাতু ছাড়া আর কিছু রেহাই পেলো না ইঁদুরের কবল থেকে।অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে শেষ পর্যন্ত সবাই সিদ্ধান্ত নিলো-মেয়রের কাছে যাবে ওরা।১২৮৪ সাল।জুনের ২৫ তারিখ।সময়টা গরমকাল হলেও থার্মোমিটার বলছে দিনের তাপমাত্রা ১৭ থেকে ১৯ ডিগ্রীতে উঠানামা করবে। সন্দেহ নেই শীতের জার্মানির তুলনায় চমৎকার আবহাওয়া। রাস্তায় খেলাধুলা আর হাসাহাসিতে মেতে আছে বাচ্চা ছেলেমেয়েরা। এ ওর গায়ে লুটিয়ে পড়ছে।নিপাট ভদ্রলোক মেয়র মল্ডিন।শহরের সবাই তাকে পছন্দ করতো। তাছাড়া হ্যামেলিনের লোকজন এতো ভালো ছিল যে, এলাকায় কোন সমস্যাই ছিল না। কাজেই সারাদিন অফিসে বসে মাটির পাইপ টানতে টানতে ঝিমানো আর নিজের চেহারা দেখানো ছাড়া তেমন কোন কাজও ছিল না মল্ডিনের।মেয়রের অফিসে ঢুকে দেখা গেলো-আগে থেকেই ওখানে মিটিং করছে কাউন্সিলররা।’এমন ইঁদুরের দল তাড়াতে হলে পুরো এক ব্যাটালিয়ন বিড়ালের দরকার আমাদের,’ বলল কাউন্সিলারদের একজন।’কিন্তু বিড়ালদের প্রায় সবগুলো হয় মারা গেছে, না হয় পালিয়ে গেছে,’ জবাব দিলো অন্য একজন।’ওদের জন্য বিষাক্ত খাবারের ব্যবস্থা করে দেখা যেতে পারে।’তবে এরইমধ্যে খালি হয়ে এসেছে খাবারের ভাঁড়ার। তাছাড়া বেপরোয়া ইঁদুরদের বিরুদ্ধে বিষ তেমন একটা কাজ করবে বলে মনে হয় না।’কারো সাহায্য না পেলে উদ্ধার পাবার কোন উপায় দেখছি না,’ এতক্ষণে কথা বললেন মেয়র।ঠিক এইসময় দরজায় জোরে করাঘাত করল কেউ একজন।’এখন আবার কে এলো?’ নগর প্রধানকে কিছুটা বিরক্ত মনে হল।নিঃশব্দে দরজাটা খুলে দিলো উপস্থিত একজন।অবাক হয়ে ওরা দেখল-দরজায় দাঁড়িয়ে আছে টিংটিঙয়ে লম্বা এক লোক। তার পরনে উজ্জ্বল চকমকে পোশাক। হ্যাটে গোঁজা একটা পাখির পালক। কাঁধ অবধি লম্বা চুল, ধূসর দাড়ি, সুচালো থুতনি। কান দুটো অস্বাভাবিক ছোট। অদ্ভুত মায়াবি তার চেহারা। হাতে সানাই’র মত লম্বা একটা কিম্ভূত বাঁশি।এর আগে কোনদিন এমন চেহারার লোক দেখেনি হ্যামেলিনবাসী।’বেশ কিছু শহরকে পোকা আর ইঁদুরের হাত থেকে রক্ষা করেছি আমি,’ কোন রকম ভণিতা না করে বলল লোকটা। হাতে ধরে আছে একটা সোনার পাইপ, ‘আমাকে একহাজার ফ্লোরিন দিন, সবগুলো ইদুরকে এখুনি তাড়িয়ে দিচ্ছি।”মাত্র একহাজার!’ আনন্দে প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন মল্ডিন, ‘যদি সফল হও, তোমাকে পঞ্চাশ হাজার ফ্লোরিন দেবো আমরা।”ঠিক আছে,’ রাজি হল অদ্ভুত লোকটা, ‘আজ দেরি হয়ে গেছে। কাল ভোরে হ্যামেলিনে একটা ইঁদুরও থাকবে না।’পরদিন সকাল।তখনো দিগন্তের নীচে রয়েছে সূর্য।হ্যামেলিনের রাস্তা আর গলিপথে ছড়িয়ে পড়ল মিষ্টি মোহনীয় বাঁশির সূর। শহরের বাসিন্দারা অবাক হয়ে দেখল বাঁশি বাজিয়ে ধীরে ধীরে বাড়িগুলোর সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে লম্বা অদ্ভুত লোকটা।তার পেছনে…ইঁদুরের পাল।দরজার কোণা থেকে, জানালার নীচ থেকে, পানির পাইপের ভেতর থেকে…বেরিয়ে এলো ওরা। মোটা-বেঁটে, সাদা-মেটে, ছোট-মাঝারি-ধেড়ে দলে দলে…মিছিলের মতো। তীক্ষ্ণ কিচমিচি শব্দে মুখরিত হয়ে গেলো আকাশবাতাস। কিন্তু বাঁশিওয়ালার কোনদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই। আপনমনে বাজিয়ে এগিয়ে চলেছে। তার লক্ষ্য অয়েজার নদী।অবাক শহরবাসী দেখল-মূল সড়ক ছেড়ে নদীর দিকে হাঁটা ধরল লোকটা। নদীর পাড়ে পৌঁছে বাঁশিতে এবার সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সূর তুলল সে। অনেকটা করুণ বিরহের মতো।তাজ্জব ব্যাপার-সে আওয়াজ শুনে একে একে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগলো ইঁদুরের দল। যেন বাঁশির সূরে কোন গোপন বার্তা ছিল। প্রবল স্রোতের টানে ভেসে যেতে লাগলো ওরা। এবং তলিয়ে গেলো।এতক্ষণে মাথার উপর উঠে এসেছে সূর্য।হ্যামিলন শহর এখন ইঁদুর মুক্ত।আনন্দের ছাপ পড়েছে টাউন হলে মেয়রের অফিসেও। মল্ডিনকে ঘিরে বসেছেন সব কাউন্সিলাররা। এই সময় হাজির হল বাঁশিওয়ালা। মেয়রকে বলল, নিজের পাওনা বুঝে নিয়ে চলে যেতে চায় সে।‘একহাজার ফ্লোরিন?’ মল্ডিনকে যেন অবাক দেখাল, ‘এই সামান্য একটা কাজের জন্য? কি বল তুমি, অ্যাঁ? কক্ষনো না…বড়জোর পঞ্চাশটা ফ্লোরিন নিতে পারো।’‘দেখুন…’ ঠকানো হচ্ছে বুঝতে পেরে প্রায় চেঁচিয়ে উঠল বাঁশিওয়ালা।‘চুপ…’ পাল্টা ধমকে উঠলেন মল্ডিন, ‘দেখো বাবা, ইঁদুরের দল আর শহরে নেই।

পানিতে ডুবে মারা গেছে ওরা, ঠিক? এ শহরে আর কোনদিন ফিরেও আসবে না। কাজেই যা দিচ্ছি তাতেই সন্তুষ্ট থাকো, বুঝলে? বেশি তেড়িবেড়ি করলে ওটাও পাবে না, বুঝলে?’উন্মত্ত ক্রোধে যেন জ্বলে উঠল বাঁশিওয়ালার চোখ, শাসানোর ভঙ্গীতে মেয়রের দিকে একটা আঙুল তুলল সে, ‘ওয়াদা ভাঙলেন আপনি। কাজটা ভালো করলেন না। এর জন্য পস্তাতে হবে আপনাকে।’কাঁধ ঝাঁকালেন মেয়র, ‘যা ব্যাটা। হয় পঞ্চাশ ফ্লোরিন নে, না হয় ভাগ।’ওইদিন রাতে।ইঁদুরের কবল থেকে উদ্ধার পেয়ে আরামে গভীর নিদ্রায় কাতর হ্যামেলিনবাসী।প্রায় শেষ হয়ে এসেছে রাত। একটু পরেই ভোর হবে।ঠিক তখন…শহরের অলিতেগলিতে ছড়িয়ে পড়ল অদ্ভুত এক বাঁশির সূর। তবে আশ্চর্যের বিষয় হল-কেবল শিশুরাই শুনল সে আওয়াজ। বড়দের কানে ধরা পড়ল না।এবং বংশীবাদক আর কেউ নয়-সেই অদ্ভুত লোকটা।এবার ইদুর নয়-দলে দলে বেরিয়ে এলো নানান বয়সী শিশুরা। বাঁশিওয়ালা যেন যাদু করেছে ওদের। দীর্ঘ মিছিলটা এগিয়ে গেলো শহরের প্রধান রাস্তা দিয়ে।চলতে চলতে বিশাল একটা পাহাড়ের পাদদেশে এসে থামল বাঁশিওয়ালা। হঠাৎ করেই তীব্রতর হল বাঁশির সূর। উৎসুক বাচ্চাদের সামনে একটা দরজার মতো খুলে গেলো পাহাড়টা।ভেতরে একটা গুহা দেখা যাচ্ছে।সার বেঁধে অন্ধকার পাহাড়ের গুহার মধ্যে ঢুকে গেলো শিশুর দল। সবার শেষে ঢুকল বাঁশিওয়ালা। সাথে সাথে কড়কড় শব্দে বন্ধ হয়ে গেলো দরজার মুখ।তবে একটা পা খোঁড়া থাকায় বেঁচে গেলো একজন শিশু (জার্মান আর্কাইভ অনুসারে দু’জন)। হতভাগ্য বাবা-মাদের দুঃসংবাদটা সে-ই জানালো।নিজেদের হারানো সন্তানদের ফিরে পেতে চারদিকের প্রতিটা ধূলিকণা খুঁজে দেখল পাগলপ্রায় স্বজনরা। জঙ্গলের প্রতিটা গাছ। ওয়েজারের প্রতি ইঞ্চি পানি।তবে কোন লাভ হল না।বহুবছর সন্তানদের খুঁজে বেড়িয়েছে পুত্র-কন্যাশোকে কাতর বাবা-মা। লাভ হয় নি কোন।যেন তাদের নিয়ে স্রেফ হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে বাঁশিওয়ালা।পাঠক,এতোটুকু পর্যন্ত আমাদের সবারই কমবেশি জানা।তাহলে কেন নতুন ক’রে পুরনো কাহিনীর অবতারণা?আসুন জানা যাক।…আজকের আগ পর্যন্ত আপনি, আমি আমরা সবাই এই গল্পটাকে নিছক কল্পনা বলেই উড়িয়ে দিয়েছি, ঠিক? আমাদের দেশের ঠাকুরমার ঝুলি কিংবা অ্যারাবিয়ান নাইটসে এমন হাজারো গল্প আমাদের জানা আছে, ঠিক না?তবে কিনা বাঘা বাঘা সব পণ্ডিত-গবেষকের দল আমাদের মতো মোটা মাথার মানুষের সাথে একমত হতে পারছেন না। প্রায় সাড়ে ছয়শ’ বছর ধরে তাঁদের অনেকেই সারাজীবন কাটিয়ে দিয়েছেন কেবল একটা কথা প্রমাণ করার জন্য-হ্যামেলিনের ‘ঘটনা’ কাল্পনিক কিছু নয় বরং ১২৮৪ সালের ওই দিনটাতে জার্মানির ছোট্ট ওই শহরটাতে লক্ষ্য করার মতো কিছু না কিছু নিশ্চয়ই ঘটেছিল। তাঁদের কথা হেলাফেলা করার মতো নয় মোটেও। এঁরা মদ খেলেও মাতাল হন না মোটেও।আসুন কিছু প্রমাণ দেখা যাক।যুক্তি একঃ১৩০০ সালে, ওই ঘটনার ১৬ বছর পর-শহরটার একমাত্র চার্চটার হারানো সন্তানদের স্মরণে একটা মলিন কাঁচের জানালা লাগান ভগ্ন মনোরথ বাবা-মা সেইসাথে জুড়ে দেন একটা ছবিও। যেখানে দেখা যায়-বিচিত্র সাজপোশাক পরা এক লোকের পেছন পেছন নাচতে নাচতে হেঁটে কিংবা দৌড়ে চলেছে একদল ছেলেমেয়ে। লোকটার হাতে বিচিত্র আকারের একটা কিম্ভূত বাঁশি।জানালাটায় যে কথাগুলো খোদাই করা ছিল-ইংরেজি করলে দাঁড়ায়-…”On the day of John and Paul 130 children in Hamelin went to Calvary and were brought through all kinds of danger to the Koppen Mountain and lost”(সুত্রঃ Zipes)।এরও একশ’ বছর পর, ১৪০০ সালের শুরুর দিকে লেখা হয়-ল্যুনেবার্গ পাণ্ডুলিপি। অন্য সব তথ্যের সাথে এখানে জার্মান ভাষায় উল্লেখ করা আছে হ্যামেলিনের এক বাড়ির দেয়ালে খোদাই করা এই অনুচ্ছেদের কথাও-ANNO 1284 AM DAGE JOHANNIS ET PAULI WAR DER 26. JUNIDORCH EINEN PIPER MIT ALLERLEY FARVE BEKLEDET GEWESEN CXXX KINDER VERLEDET BINNEN HAMELN GEBORENTO CALVARIE BI DEN KOPPEN VERLOREN (‘১২৮৪ সালের ২৬ জুন সেইন্ট জন ও সেইন্ট পল দিবসে বিচিত্র এক বংশীবাদকের সম্মোহনে তার পেছন পেছন কোপেনের পাহাড়ে ক্যালভারীতে নিখোঁজ হয় হ্যামেলিনে জন্ম নেয়া ১৩০ জন শিশু ।”প্রিয় পাঠক,একটা কাল্পনিক ঘটনা কিংবা মিথ’র জন্য এমন শোক প্রকাশ একটু অস্বাভাবিক, নয় কি? তা-ও চার্চের দরজায় কিংবা ঐতিহাসিক দলিলপত্রে?আপনি কি বলেন?১৬০৩ সালের দিকে টাউনহল মেয়রের অফিসের কাছাকাছি স্থাপন করা হয় একটা মনুমেন্ট এবং জায়গাটার নাম রাখা হয়-দ্য পাইড পাইপার হাউজ। চার্চের জানালার মতো ক’রে এখানেও প্রায় অনুরূপ একটা ছবি লাগানো হয়-বাঁশিওয়ালার সাথে শিশুদের ছবি।১৬৬০’র দিকে প্রাকৃতিক কারণে ধ্বংস হয়ে যায় হ্যামিলন চার্চের জানালাটা। পরবর্তীতে একে পুনঃনির্মাণ করেন ঐতিহাসিক হ্যান্স ডোবারটিন।মজার ব্যাপার হল-হ্যামিলন এবং তার আশপাশের বহু শহর জুড়ে এই ঐতিহাসিক ঘটনার অনেক প্রমাণ সংরক্ষিত থাকলেও যদি কখনো কোন বিজ্ঞানীকে জিজ্ঞেস করা হয়, স্যার, বলুন তো, কি ঘটে থাকতে পারে সেদিন?’স্রেফ অস্বীকার করে বসবেন ভদ্রলোক! কেবল তিনিই নন, তাঁর মতো অনেকেই আছেন, নিশ্চিত ব্যাখ্যা দিতে না পারায় যারা পাশ কাটিয়ে যান ব্যাপারটাকে।দেখা যাক আর কি কি পাওয়া যায়…১২৮৪ সালের ওই ঘটনার ব্যাপারে নানা মুনির আছে নানা মত।কেউ বলেন, ‘ও ব্যাটা পাইড পাইপার আসলে ছিল বিকৃত রুচির এক শিশুকামী।”বেশ, মানলাম। তা এতজন শিশুকে নিয়ে গেল কীভাবে?’…ব্যাখ্যা নেই।কারো কারো মতে, ব্ল্যাক ডেথ মহামারিতে মারা যায় এসব শিশু। শোকাহত গ্রামবাসী পরে এই কাহিনী বানিয়েছে।১৫৫৬ সালে এসে বলা হতো-বংশীবাদক আসলে ছিল স্বয়ং শয়তান।আর এখনকার রকেটের যুগে হ্যামেলিনের গল্প পেয়েছে নতুন মাত্রা। কেউ কেউ বলছেন-আসলে বাঁশিওয়ালা ছিল কোন এক এলিয়েন। কোপেন পাহাড়ের আড়ালে লুকিয়ে রাখা মহাকাশযানে করে নিজের গ্রহে নিয়ে গেছে শিশুদের। বাঁশির মতো যন্ত্রটা দিয়ে নির্দিষ্ট ফ্রিকুয়েন্সির সুর বাজিয়ে কখনো ইঁদুর, কখনো শিশু আকর্ষণ করতে পারত সে।মনে করিয়ে দিই-হ্যামেলিনকে ঘিরে যে পাহাড়টার উল্লেখ আগে করা হয়েছিল তার নাম-কোপেন।আপনি কেন, খোদ আমিই বলবো-ব্ল্যাক ডেথ কিংবা এলিয়েন থিওরি-নির্দ্বিধায় অতিরঞ্জন; বেশী বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে ব্যাপারটা।তবে বাড়িয়ে বলা হলেও ঘটনাটা অস্বীকার করে কিন্তু এঁদের কেউই কিছু বলেন নি!সুত্রঃদুইযীশুখ্রিষ্টের জন্মকে আমরা স্মরণ করি ‘খ্রিষ্টাব্দে’র মাধ্যমে। যখন কোন প্রাচীন ঘটনার উল্লেখ হয়, আমরা বলি-অমুক খ্রিষ্টাব্দের অতো তারিখে ঘটনাটা ঘটেছিল, ঠিক?হ্যামেলিন শহরের সরকারি ঐতিহাসিক রেকর্ড রাখার জন্য রেফারেন্স হিসেবে প্রায় সময়ই ব্যবহার হয় ১২৮৪ সালের ওই দিনটাকে। ১৩৮৪ সালের একটা এন্ট্রি অনেকটা এরকম-‘১০০ বছর হতে চলল আমাদের শিশুদের হারিয়েছি।’কাল্পনিক গল্প কিংবা রূপকথা কি এতদূর, এতো গভীরে যাওয়ার কথা ?…বিশ্বাস হয়?…’যেবছর পঙ্খিরাজ ঘোড়া নিয়ে ডালিমকুমার তার রাজ্যে ফিরে এলো-সে বছর সুজিত রঞ্জন দেব জন্মগ্রহণ করেন,’এমন কথা আপনি ব্যবহার করেছেন কোনদিন?সুত্রঃ তিনসাল ১৩৮৪।তাঁর নাম ডেকান লুড। ভদ্রলোক হ্যামেলিনের মুরুব্বী স্থানীয় নাগরিক। প্রায় ১০০ বছর ধরে ল্যাটিনে লেখা একটা বই নিজের কাছে আগলে রেখেছেন লুড। ১২৮৪ সালের ওইদিন অদ্ভুত বাঁশিওয়ালার কীর্তিকলাপ আর নিষ্পাপ বাচ্চাদের হারিয়ে যাওয়ার ঘটনার চাক্ষুষসাক্ষী তাঁর দাদীমা লিখে রেখে গেছেন বইটা। অন্য অনেকের সাথে সেদিন টাউন-হল মেয়র অফিসের ঠিক বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন ভদ্রমহিলা।বংশপরম্পরায় বইটা খুব যত্নে রেখেছে লুড পরিবার। আফসোসের বিষয় -সতেরো শতকে কীভাবে জানি হারিয়ে যায় বইটা।পাঠক,জার্মানি গেলে হ্যামেলিন ঘুরে আসতে ভুলবেন না যেন!শহরের রাস্তায় রাস্তায় মোড়ে মোড়ে কখনো ইঁদুরের সাথে, কখনোবা বাচ্চাদের সাথে স্থাপিত বাঁশিওয়ালার মূর্তি সামান্য সময়ের জন্য হলেও আপনাকে নিয়ে যাবে সাতশ’ বছর আগের সেই দিনটাতে।চলতে চলতে যদি এমন এক রাস্তায় আসেন-যেখানে সবকিছু চুপচাপ-শুনশান, অবাক হবেন না; জানবেন আপনি এখন আছেন Bungelosenstrasse (ড্রামহীন পথ)। প্রায় সাতশ’ বছর ধরে এ রাস্তায় সব ধরনের গান কিংবা বাদ্যযন্ত্র বাজানো নিষিদ্ধ!কারণ?১২৮৪ সালে এই রাস্তা ধরেই শিশুদের নিয়ে গিয়েছিল বাঁশিওয়ালা।দিনটার স্মরণে বানানো হয় মুদ্রাও। লেখা হয়েছে অনেক কবিতা, গল্প আর উপন্যাস বানানো হয় চলচ্চিত্রও।সুত্রঃচারমিস্টার ডোবারটিন কি বলেন?পেশায় একজন স্কুল শিক্ষক ভদ্রলোক। হ্যামেলিনের নিখোঁজ শিশুদের নিয়ে পড়াশোনা করেই কাটিয়েছেন জীবনের বেশিরভাগ সময়।’আসলে লোকটা ছিল একজন আদমব্যাপারি,’ মিস্টার ডোবারটিন বলেন, ‘ওদের নিয়ে ‘স্লাভ’র দিকে যায় সে। তখনকার দিনে দেশটা খুবই লোভনীয় ছিল।’তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস, বাঁশিওয়ালাকে অনুসরণ করে উত্তর-পূর্ব দিকে যায় শিশুরা; ওখানে একটা জাহাজে চড়ে পোমেরানিয়ান উপকূলের (বর্তমানে পোল্যান্ডের অন্তর্ভুক্ত) কোথাও পৌঁছে ওরা।বছরের পর বছর পুরনো নথিপত্র ঘেঁটে এসব তথ্য উদ্ধার করেছেন ডোবারটিন।সুত্রঃ পাঁচকে এই রহস্যময় কাউন্ট নিকোলাস ভন স্পিয়েজেলবার্গ?পুরনো দলিলপত্র ঘাঁটার সময় এই জার্মান উপনিবেশ স্থাপনকারীর সন্ধান মিলে। ১২৮২’র আশপাশের বছরগুলোতে হ্যামেলিনের কাছাকাছি নানান জায়গায় তাঁর উপস্থিতির প্রমাণ রয়েছে। ১২৮৪’র ৮ জুলাই শেষবারের মতো হের স্পিয়েজেলবার্গকে দেখা যায় বাল্টিক সাগরের তীরে জার্মান বন্দর স্টেটিনে। হ্যামেলিনের শিশুরা অদৃশ্য হওয়ার ঠিক বারো দিন পর।লক্ষ্য করার বিষয় হল-হ্যামেলিন থেকে স্টেটিন যেতে ঠিক ওই বারো দিন সময়ই লাগে!রেকর্ড থেকে আরো জানা যায়-স্পিয়েজেলবার্গের সঙ্গে তাঁর দুই ভাইও ছিল। হ্যামেলিনের ওই ঘটনার পরে জার্মানি দূরে থাক; দুনিয়ার কোথাও তাদের কাউকে আর কোনদিন দেখা যায়নি।এরমানে কি?স্পিয়েজেলবার্গ, একজন জার্মান কাউন্টই কি ছিলেন ওই বাঁশিওয়ালা? দুর্গম অঞ্চলে নতুন বসতি স্থাপনের জন্যই এমন কৌশলে বাচ্চাদের অপহরণ করলেন তিনি?…কেউ বলতে পারে না।আবার ফালতু বলে উড়িয়েও দেয় না।তবে এটা সত্যি যে, ছেলেবেলায় যে কাহিনী ‘রূপকথা’ হিসেবে শিখিয়ে দেয়া হয়েছিল আমাদের; ব্যাপারটা মোটেও কাল্পনিক কিছু নয়।পাঠক,আপনারা কি বলেন?ঋণ স্বীকারঃ-জার্মান আর্কাইভ ফর অ্যানসিয়েন্ট হেরিটেজ-উইকিপিডিয়া-ZIPES-জার্মানি ইন মেডিয়াভ্যাল এজঃ ফোক এন্ড কালচার।উৎসর্গঃআজকাল কোন এক অজানা কারণে মানুষের জন্মদিন মনে রাখতে পারছি না। সম্ভাব্য সকল উপায়ে চেষ্টা করা হয়ে গেছে। মোটা মোটা কালিতে ডায়রিতে লিখে রাখি। কাজের সময় দেখা যায় কোন ডায়রিতে লিখেছি-মনে থাকছে না। বেশ ক’বছর ধরে দেয়ালে একটা ক্যালেন্ডার রাখাই হয় বার্থ-ডে রিমাইন্ডার হিসেবে।এমন ক্যালেন্ডার এখন বইয়ের মলাট হয়ে ঝরে পড়ছে।ফলে কারো কারো জন্মদিনের দুইমাস আগেই মেসেজ করছি-Happy Birthday, Dear. Many Many Happy Returns.আবার কারো বেলায় উইশ যাচ্ছে জন্মদিন পেরিয়ে যাবার দু’সপ্তাহ পর- শুভ জন্মদিন, বাবা। ভালো থাকিস, অনেক ভালো। (এমন অনাসৃষ্টির জন্য গত একমাস ধরে আমার সাথে কথাই বলছে না কেউ কেউ।)কারো কারো বেলায় তেমনটাও করতে পারছি না।’এক কাজ করিস না কেন?’ এক বন্ধু একদিন পরামর্শ দিলো, ‘মোবাইলে রিমাইন্ডার দিয়ে রেখে দে, দেখবি টাইম মতো মনে করিয়ে দেবে।’গোল বাঁধছে সেখানেও।দেখা যাচ্ছে রিমাইন্ডার দেবার প্রায় পুরোটা সময় আমার ফোন থাকে সুইচড অফ।একের পর এসব বিপত্তির গুঢ় রহস্য আমার কাছে একেবারেই অস্পষ্ট এবং ভূতুড়ে। একজন সাইকিয়াট্রি এক্সপার্টকে ভিজিট করাটাও বিবেচনাধীন আছে।মানুষের প্রতিটা নিউরনকে তুলনা করা হয় একেকটা কম্পিউটারের সাথে। সেখানে আমাদের মস্তিস্ক খুব যত্ন নিয়ে আলাদা আলাদা ফোল্ডারে সাজিয়ে রাখে দরকারি তথ্য। সে হিসেবে আমার মাথায় কম্পিউটার থাকার কথা কমবেশি ৩৫ বিলিয়ন। এতোগুলো hp কিংবা dell একসাথে Turn Off হয়ে যাওয়া-অবাক হবার মতই।নাকি অন্য কিছু ঘটছে?শুনেছি ৩৫ এর পর থেকে প্রতিদিন নাকি নষ্ট হতে শুরু করে বেশ কিছু নিউরন। সে হিসেবে গত ছয় বছরে আমার কতোটা কম্পিউটার নষ্ট হল কে জানে।যদি এমন হয়-যে যে ফোল্ডারে জন্ম তারিখ লেখা থাকে; সেগুলোর মেমোরি delete হয়ে গেছে? না কি ভাইরাস ঢুকে গেলো? ফাইল malware corrupted?যাই ঘটে থাকুক-এজীবনে আর শোধরাবার কোন উপায় মনে হয় বাকি নেই। আমার second hand-পুরনো কম্পিউটারে এখন আর anti-virus install করে লাভ হবে বলে মনে হয় না।কাজেই ‘জান এবং প্রাণ’ বাঁচানোর মোটামুটি একটা সমাধান দাঁড় করিয়েছি এভাবে-এখন থেকে কিছু কিছু লেখায় জানুয়ারির ১ থেকে ডিসেম্বরের ৩১ পর্যন্ত সবগুলো তারিখ উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট birthday boy/girl এর নামে উৎসর্গ করা হবে।যেহেতু এই ১২ মাসের বাইরে আর কোন হিসেব জ্ঞানত গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে রাখা হয়নি-৩৬৫ না হয় ৩৬৬ দিনের মধ্যে কোন না কোন একটা দিনে এদের জন্ম হতেই হবে!’হ্যামেলিনের বাঁশিওয়ালা’ শিরোনামের লেখাটা এদের জন্যশুভ জন্মদিন

লেখক: সুজিত রঞ্জন দেবজীববিদ্যা বিভাগস্কলার্সহোমশাহী ঈদগাহসিলেট।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close