ফিচার

জুবায়ের সিদ্দিকী : আত্মসচেতন লেখক ও শুভ্রমনের মানুষ

বায়েজীদ মাহমুদ ফয়সল: ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জুবায়ের সিদ্দিকী (অব.) একজন স্বাধীনচেতা, প্রত্যয়দীপ্ত ও শুভ্রমনের মানুষ। নীরবে কাজ করে যাওয়াই তাঁর স্বতন্ত্রবৈশিষ্ট্য। কর্মজীবনে তিনি সফলকাম ব্যক্তিত্ব। নতুন কর্মক্ষেত্রে এসেও দক্ষতার পরিচয় রেখে যাচ্ছেন। স্বীয় অভিজ্ঞতায় পারদর্শি হয়ে ওঠেছেন। সিলেটের সুশীল কেন্দ্রে নিজেকে সমাসীন করতে পেরেছেন। কর্মক্ষমতা, সৃজনশীলতা তাকে শ্রদ্ধার পাত্রে পরিণত করেছে। সমাজ উন্নয়ন, মানব সম্পদ উন্নয়নের পরিচর্যায় তিনি একজন দক্ষ কারিগর। শিক্ষাবিদ হিসেবে ছাত্র ও অভিভাবক মহলে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা স্বীকৃত। সিলেটের সর্বমহলে তার কর্মযজ্ঞ প্রশংসিত। পাশাপাশি লেখক-কলামিস্ট হিসেবে নন্দিত। স্থানীয় জাতীয় বহুতর সমস্যার উপর নিরপেক্ষ চিন্তা চেতনা নিয়ে লিখছেন অহরহ।জুবায়ের সিদ্দিকী অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল। কিন্তু এ-পরিচয় তাঁর নিতান্তই অসম্পূর্ণ। তিনি একাধারে একজন দেশপ্রেমিক গর্বিত সৈনিক, খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ এবং সৃষ্টিধর জীবনী লেখক। ইতোমধ্যে তাঁর চারটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে : স্মৃতির অলিন্দে (জুন ২০০৩), কালের কথামালা (জুন ২০০৮), আমার জীবন, আমার যুদ্ধ (…..), সময় সংকট ও সম্ভাবনা (২০১৩)।তাঁর জীবনালেখ্য বিচিত্র এবং বর্ণাঢ্য। প্রথম চাকুরি হিসেবে তিনি বেছে নেন সৈনিকজীবন। ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে যোগদান করে তিনি কোর অভ আর্টিলারিতে কমিশনপ্রাপ্ত হন। এবং সুষ্ঠু দায়িত্ব পালনের স্বীকৃতি হিসেবে উন্নীত হয়েছেন উচ্চতর পদে। দীর্ঘ ৩২ বছর অত্যন্ত বর্ণাঢ্য সামরিক জীবন শেষ করে ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে অবসর নেন। অবসর নেওয়ার পর তিনি এখন একটি বেসরকারি কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন।তাঁর সৈনিকজীবন ও ব্যক্তিজীবন ঘটনাবহুল এবং সমান সার্থক। আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে তিনি পাকিস্তানের অসূর্যম্পর্শ্য বন্দিশিবিরে দুর্বিষহ বেদনার মধ্যে দিনগুজরান করেছেন। ১৯৯০-এ তিনি সৌদি আরবে মিত্রবাহিনীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কর্মসূত্রে পৃথিবীর চব্বিশটি দেশ ভ্রমণ করেছেন। দেখেছেন গভীর অভিনিবেশে মানুষ ও প্রকৃতি। তাঁর এই দেখার মধ্যে কোনও ফাঁক নেই, ফাঁকি নেই। তাঁর সশস্ত্র এবং ভাবুক ঘোরাফেরা আমাদের বিস্মিত ও মুগ্ধ করে।তাঁর রচনাসম্ভার ছেকে আমরা তাঁর জ্ঞানের গভীরতা আঁচ করতে পারি। লেখালেখির জীবনে তিনি বিভিন্ন স্বাদের রচনা লিখেছেন এবং গ্রন্থিত করেছেন।

আমরা ব্যক্তি জুবায়ের থেকে লেখক জুবায়েরের নিবিড় পাঠ পর্যালোচনার চেষ্টা করব।তাঁর আত্মকথা নিয়ে লেখা গ্রন্থটির প্রতি যদি আমরা দৃষ্টি নিবদ্ধ করি তাহলে একজন জুবায়েরের বিনির্মাণ তত্ব আমরা পেয়ে যাই। আমার জীবন আমার যুদ্ধ জুবায়ের সিদ্দিকীর জীবন ও কর্মের এক নিবিড় পর্যবেক্ষণ। তিনি আত্মকথায় শুনিয়েছেন খন্ড খন্ড জীবনের রোমাঞ্চকর পর্বের কথা। শুধু যুদ্ধবিগ্রহের শৌর্যবীর্যের কথা নয়, নিজের এবং পরিবার-পরিজনদের নিভৃত জীবনের কথা লিপিবদ্ধ করেছেন। তাঁর লেখায় বহু চরিত্রের আবির্ভাব দেখি আমরা; বহু ঘটনার উপস্থাপন লক্ষ করি। অনুভব করি লেখকের দরিদ্র পিতার দীনতার অকপট আর্তি; অর্থপীড়িত জো নামের চীনা যুবকের বিয়ে না-করার গোপন কষ্টের কথা; স্বামীভক্ত মান জুয়ানির সমুদ্রের জলে আত্মহত্যার কথা।এ গ্রন্থে জুবায়ের সিদ্দিকীর সানুপুঙ্খ জীবনী নয়Ñতবু ‘কিছু রাখো-ঢাকো’ নীতি না-মেনে নিপুণ-সংক্ষিপ্ততায় তিনি শুনিয়েছেন তাঁর জীবনের বিভিন্ন পর্বের অকপট কথা। আর তাঁর ব্যক্তিগত স্মৃতিরোমন্থনে প্রতিবিম্বিত হয়েছে গোটা সেনা সমাজের চিত্র। এই সূত্রে জাতীয় জীবনের বহু অজানা তথ্যেরও হয়েছে উজ্জ্বল উদ্ধার। আর এখানেই ধরা আছে একজন মহৎ মানুষের মহৎ অন্বেষণ।তাঁর জীবনের সঞ্চয় বেশি। তদুপরি উচ্চমানের কবি হওয়ায় তাঁর ভাষায় মাধুর্যতা মাদকতা আছে। সরস, প্রাণবন্ত, প্রাঞ্জল ভাষায় রচিত স্মৃতিকথা কাব্যময় হয়ে উঠেছে। তাঁর সমৃদ্ধ রচনা এতই আকর্ষণীয় যে দ্রুত পড়ে নেবার ইচ্ছা জাগে। এতটুকু সরস রসাত্মক না-হলেও এরই ধারাবাহিকতায় ‘আমার জীবন আমার যুদ্ধ’ রচনা কাঠামোটি তিনি তৈরি করেছেন। এটি তাঁর জীবনের অসংখ্য ঘটনার সংমিশ্রণে লিখিত আত্মকথা।লেখক তাঁর স্মৃতিকথাকে ঝেড়ে মুছে নতুন আলোকে পরিবেশন করেছেন। এতে নতুনত্বের ছাপ আছে। এ প্রসঙ্গে লেখক বলেন, ‘শৈশব থেকে বেড়ে ওঠা, দীর্ঘ তিন দশকের সৈনিকজীবন আর অবসর পরবর্তী জীবনের কত স্মৃতি কত বিচিত্র রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা সঞ্চিত আছে। এর সবগুলো যদি লিপিবদ্ধ করা সম্ভব হতো তাহলে এক বিশাল গ্রন্থ রচনা করা যেত। আর প্রতিটি সাধারণ মানুষের জীবনই এমন সব বিচিত্র ঘটনায় সমৃদ্ধ। কিন্তু জীবনের সব স্মৃতিকেই গুছিয়ে আকর্ষণীয় করে তুলে ধরা এক দুঃসাধ্য কাজ। আর তাই অসংখ্য স্মৃতির ভিড় থেকে টুকরো টুকরো স্মৃতিগুলোর মধ্যে যেগুলো সবচেয়ে আকর্ষণীয় আর স্মরণীয় মনে হয়েছে সেগুলোকেই এই গ্রন্থে সন্নিবেশিত করার চেষ্টা করা হয়েছে (আমার জীবন, আমার যুদ্ধ, পৃষ্ঠা-৮)।’জীবনকথার পাশাপাশি তিনি লিখেছেন মৌলিক প্রবন্ধ-নিবন্ধ। এগুলো বিভিন্ন স্থানীয় ও জাতীয় সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর একটি কলাম বা প্রবন্ধ সংকলন থেকে কিছু উদ্ধৃতি এখানে টানবো। তাতে কিছুটা হলেও তাঁর লেখনি শক্তি কতটা সমাজের কাছাকাছি, সাধারণ মানুষের হৃদয় ছোঁয়া ও সমকালীন প্রয়োজনীয় তা বুঝা যাবে।‘সংঘাতপূর্ণ গণতন্ত্র: সমঝোতা উত্তরণের একমাত্র উপায়’ প্রবন্ধে লেখক অনেক ত্যাগ, তিতিক্ষা, আন্দোলন, সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যে গণতন্ত্রের উত্তরণ ঘটেছে তা যেন রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অভাবে বাধাগ্রস্থ না হয়, সে ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকতে বলেছেন। এমনিভাবে তিনি ‘ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক’ প্রবন্ধে বঙ্গোপসাগরে জেগে ওঠা তালপট্টি দ্বীপের মালিকানা সংক্রান্ত বিষয়, তিস্তাসহ উভয় দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদীসমূহের পানি বন্টন সমস্যা, সিলেট সংলগ্ন সুরমা নদীর উজানে প্রস্তাবিত টিপাইমুখ বাঁধপ্রকল্প, সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক নির্বিচারে বাংলাদেশি হত্যা, বাংলাদেশ থেকে পলাতক সন্ত্রাসীদের হস্তান্তর না করা , বাণিজ্যিক ভারসাম্যহীনতা ইত্যাদি চমৎকার ভাবে উপস্থাপন করেছেন।এরপর আন্তর্জাতিক সমস্যা নিয়ে তিনি লিখেছেন মিয়ানমার গণতন্ত্রায়ন ও আঞ্চলিক রাজনীতি, ‘চলমান সন্ত্রাস বিরোধি য্দ্ধু এবং লাদেন পরবর্তী বিশ^’। ‘পশ্চিমাতোপের মুখে এবার ইরান’ ‘ত্রিমুখী সংকটের আবর্তে পাকিস্তান’ ‘ইরান এবং মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক কৌশলগত ভারসাম্য’ ইত্যাদি প্রবন্ধ। জুবায়ের সিদ্দিকী যেখানেই দেখেছেন অত্যাচার, অবিচার, সেখানেই তাঁর লেখনীর মাধ্যমে তিনি সোচ্চার থেকেছেন।লেখক তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময় নিয়ম শৃংখলার মধ্যে কাটিয়েছেন। তাই তিনি সমাজে যে কোনো ধরণের বিশৃংখলা পরিবেশকে মেনে নিতে পারেননি। তাঁর লেখাগুলোতে শৃংখলাবোধ ও মানবতাবোধ সুষ্ঠুভাবে ফুটে ওঠেছে।তাঁর এসব মৌলিক লেখা পাঠ করে আমরা তাঁর অন্তরলোক সম্পর্কে পুরোপুরি না হলেও সম্যক ধারণা লাভ করতে পারি। জুবায়ের সিদ্দিকী লেখনীর মাধ্যমে সমাজের মানুষকে জাগিয়ে তুলবেন। মানুষ তাঁর লেখা পাঠ করে সচেতন হয়ে ওঠবে। আগামি দিনের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার প্রত্যয়ে তারা কর্মমুখী জীবন সাজাবে। একজন লেখকের পাঠকের কাছে এটাইতো আরাধ্য। জুবায়ের সিদ্দিকীর আশাও তাই থাকবে এটাই আমার প্রত্যাশা।লেখক : প্রাবন্ধিক, প্রকাশক ও সংগঠক

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close