বিনোদন

নাটক কোর্ট মার্শাল

মহান মুক্তিযুদ্ধের আলোচিত নাটক কোর্ট মার্শাল। দেশে-বিদেশে আলোড়ন সৃষ্টিকারী নাটক কোর্ট মার্শল। সিলেটের ঐতিহ্যবাহী এবং প্রথিতযশা নাট্যসংগঠন কথাকলি আবারো নাটকটি মঞ্চে আনছে। সামাজিক শ্রেণিদ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, সামন্ত প্রবৃত্তির উৎপীড়ন বা চিন্তার স্তরে সামাজিক নৈরাজ্যের পাশাপাশি সত্য আবিষ্কারের সংগ্রাম ‘কোর্ট মার্শাল’ নাটকের মূল প্রতিপাদ্য। প্রায় দেড় ঘণ্টার ব্যতিক্রম গল্পের এ নাটকটিতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস উঠে এসেছে অত্যন্ত জোরালোভাবে। মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীদের যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে সেই আলোকেই নির্মিত ‘কোর্ট মার্শাল’। নাটকে বীরাঙ্গনা প্রসঙ্গটিও উঠে এসেছে স্পর্শকাতরভাবে। নাটকে ফুটে ওঠে পৃথিবীর শ্রেণি সংগ্রামের ইতিহাসে পরাজিত শ্রেণির এক মানুষ সিপাহী আকবর আখ্যান। আকবরের মা বীরাঙ্গনা। মুক্তিযুদ্ধে যারা মানসিক ও মানবিক ক্ষতের দাগ নিয়ে বেঁচেছিলেন জাতি তাদেরকে দেয় বীরাঙ্গনার সম্মাননা। কিন্তু আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়া মায়ের বীরাঙ্গনা উপাধি আকবরকে সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে দেয়নি, বরং তাড়া করেছে লজ্জা ও অপমানের হিংস্র থাবায়। আকবরকে অপদস্থ করেছে তারা- যারা মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীদের উত্তরাধিকার। একসময় যারা আবার ফিরেছে ক্ষমতার অংশীদারিত্বে। তবু ঘুরে দাঁড়ায় সিপাহী আকবর। বিচার যেখানে অন্ধ; সেখানে অবিচার দিয়ে অবিচারের পথ রোধ করে আকবর। গল্পে ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিদের প্রতিনিয়ত নির্যাতন ও নিষ্পেষণে একসময় অধীন ব্যক্তিরা হয়ে উঠে প্রতিবাদী। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সমাজে তাদের জায়গা হয় না।
আবার অন্যদিকে, নাটকে দৃশ্যমান হয় মানবসভ্যতার ইতিহাস এবং সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্ব। পৃথিবীর ইতিহাস মূলত মানবসভ্যতার ইতিহাস। আর মানবসভ্যতার ইতিহাস হলো অজানাকে জানার ইতিহাস। অজানাকে জানতে গিয়ে সত্য এবং মিথ্যার মধ্যে সৃষ্টি হয় দ্বন্দ্ব এবং এই দ্বন্দ্ব থেকেই বেরিয়ে আসে অন্য এক সত্য, যা সভ্যতা তৈরি করে। অনেক সময় চলিত সত্যের মধ্যেই মিথ্যের বীজ থেকে যায়। অন্য কথায় বলা যায়, একটা ভিন্ন সত্যের অস্তিত্ব যেন থেকে যায়। এমন সব সত্য মানুষকে দেখাতে পারে মুক্তির পথ।
কবি নজরুল অডিটোরিয়ামে আগামী ১১ মার্চ সোমবার সন্ধ্যা সাতটায় বহুল প্রশংসিত কোর্ট মার্শাল মঞ্চস্থ করবে সিলেটের শক্তিমান নাট্যসংগঠন কথাকলি। এটি হবে কথাকলির ৩০তম প্রযোজনা। নাটকটির মূল লেখক স্বদেশ দীপক, রূপান্তর ও নির্দেশনা দিয়েছেন এস এম সোলায়মান, নির্দেশনায় রয়েছেন আমিনুল ইসলাম লিটন।
নাটকটিতে অভিনয় করেছেন- অরিন্দম দত্ত চন্দন, আমিনুল ইসলাম লিটন, শামসুল বাসিত শেরো, আমিরুল ইসলাম বাবু, আনোয়ার হোসেন রনি, নীলাঞ্জনা দাশ টুকু, মঞ্জুর আহমদ, সৈয়দ ফয়সল আহমদ, প্রশান্ত দে প্রলয়, গোলাম সারোয়ার তালুকদার নয়ন, রোহেনা সুলতানা, আবেদ আব্দুল্লাহ রব্বানী শান্ত। লাইটে রয়েছেন হুমায়ুন কবীর জুয়েল এবং আবহ সঙ্গীতে আছেন কমলজীৎ শাওন ও বাপ্পী ত্রিবেদী।
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল ছাড়া ভারতের আসামেও কথাকলির নাটকটির প্রদর্শনী বিপুল প্রশংসা কুড়িয়েছে। বাংলাদেশের অনেক থিয়েটার দুই শতাধিকের অধিক ‘কোর্ট মার্শাল’ মঞ্চে এনেছে। কিন্তু এখনো কথাকলির কোর্ট মার্শালের আবেদন ফুরিয়ে যায়নি। নাটকের প্রতিটি চরিত্রে উঁচু মাপের অভিনেতারা প্রশংসিত হয়েছেন। দেশ-বিদেশের অনেক প্রতিথযশা নাট্যব্যক্তিত্ব কথাকলি’র প্রযোজনাকে স্বাগত জানিয়েছেন। সিলেটে যতবারই কথাকলি নাটকটি মঞ্চস্থ করে ততবারই অডিটোরিয়াম থাকে লোকারণ্য। গল্পের গাঁথুনি এবং অভিনয়শৈলির কারণে সিলেটের বাইরের মঞ্চে এখনো জনপ্রিয় কথাকলির কোর্ট মার্শাল।
বারবার মঞ্চস্থ হচ্ছে। দেখতে দেখতে অনেক দর্শকের কাছে কোর্ট মার্শালের গল্প মুখস্ত হয়ে গেছে। তবু কমছেনা দর্শকপ্রিয়তা। এখন গল্পের চেয়ে কথাকলি’র অভিনয়শৈলী যেন বেশী আকর্ষণ করে দর্শকদের। আমাদের বিশ্বাস ‘কোর্ট মার্শাল’ নাটকটি আমাদের চেতনাকে শাণিত করবে। একাত্তরের ইতিহাস বিকৃতির দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া সূক্ষ্মভাবে ফুটে উঠেছে এ নাটকের মাধ্যমে। তরুণ প্রজন্মকে একাত্তরের সঠিক ইতিহাস জানানো খুবই জরুরি, এ জরুরি কাজটাই সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছে কথাকলি।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close