ফিচার

কাঁকড়া ও মাকড়সা

এম, আশরাফ আলী: সুন্দরবনের গভীরে বয়ে গেছে একটি ছোট্ট খাল। এখানে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের বাস। রয়েছে হরিণ, বানর আরও কত কী? মাঝে মাঝে খাল পেরিয়ে বাঘ যায় ওপারে হরিণ ধরতে। খালে পিলপিলে ¯্রােত। পানির চেয়ে পলিই বেশি। কারণ কার্তিকের শেষ। খালের পানি কমে গেছে। খালের পারে গোল গোল গর্ত। কোনটাতে থাকে সাপ আবার কোনটাতে কাঁকড়া। অবশ্য পানি কমে যাওয়ায় সাপ পালিয়েছে বনে। আর কাঁকড়া? ওরাতো পালাতে পারে না। ওদের বাঁচার জন্য পানি চাই। দিনে পানিতে থাকে আর রাতে গর্তে। এমনি করে চলে ওদের জীবন। গভীর অরণ্যে জংলী মানুষ শিকারে আসে। কাঁকড়া ধরার ফাঁদ পাতে ওরা। ওদের ফাঁদে পড়ে অজ¯্র কাঁকড়ার মৃত্যু হয়। তারপরও যারা বাঁচে এখানেই থাকে ঝুঁকি নিয়ে।
খালের পাড়ে হেলানো গাছে থাকে মাকড়সা। ও এখন যৌবনে পা দিয়েছে। জাল পেতে খাবার প্রস্তুত করা শিখেছে। হেলানো সুন্দরী গাছের দু’টি ডাল জুড়ে বিরাট এক জাল বুনেছে সে। মশা, ছোট ছোট পোকা ওড়ে যাবার সময় জালে আটকে যায়। আর ওগুলো ধরে ধরে মজা করে খায় মাকড়সা।
খালের পারে গর্তে থাকা ছ্ট্টো কাঁকড়া একদিন ভোরে রোদ পোহাচ্ছিল। হঠাৎ মাকড়সা এর সাথে পরিচয়।
হ্যালো-মাকড়সা, কেমন আছো?
-হ্যাঁ কাঁকড়া ভাই ভালো আছি।
-তুমি কেমন?
-আরে দেখতেই তো পাচ্ছো কেমন আরামে আছি। গতকাল বেশ কয়েকটি ছোট মাছ খেয়েছিলাম। রাতে বেশ আরামের ঘুম হয়েছে। একটানা ঘুমের পর হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেছে। ভাবলাম উঠে যাই। একটু হাঁটাহাঁটি করি। রৌদ্রে গা জুড়াই। একটু বেলা হলে খাবারের সন্ধানে যাবো।
-শুনে খুশি হলাম কাঁকড়া ভাই। আমারও দিন ভালোই কাটছে। কার্তিক মাসে মশার ব্যাপক বংশবৃদ্ধি হয়। ফলে মশার উপদ্রব বেড়ে যায়। সেই সুযোগে আমি জাল বুনেছি। রোজ রোজ অনেক মশা জালে আটকে যায়। আর আমি মজা করে খাই।
-তাইলে দিনপাত ভালোই যাচ্ছে মাকড় ভাই?
-হ্যাঁ তোমাদের দোয়ায় ভালোই আছি।
-আচ্ছা মাকড় ভাই আজ আসি। খাবার ধরে আনার সময় হয়েছে। তাড়াতাড়ি যেতে হবে। ওদিকে জংলী মেয়েরা বেরিয়ে পড়লেই বিপদ। জাল দিয়ে ওরা পানি ঘোলা করে ফেলে। শিকার ধরবো কি? ওরা আমাদেরই শিকার করে বসে।
-ঠিক আছে কাঁকড়া ভাই অন্যদিন কথা হবে।
জংলী মেয়েরা ফাঁদ পেতে প্রতিদিন পাঁচ কেজি-দশ কেজি করে খাল থেকে কাঁকড়া ধরে নিয়ে যায়। হাটে বিক্রি করে প্রচুর টাকা পায়। এগুলো বিদেশেও রপ্তানি হয়। চায়না, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, লাওস এ সকল দেশে কাঁকড়ার ব্যাপক চাহিদা। তাই শীত মওসুম শুরু হতেই কাঁকড়া শিকারিরা খালে ব্যাপক তল্লাশী শুরু করে। কাঁকড়ার দল জংলী মেয়েদের ভয়ে তটস্থ থাকে। কখন জানি জাল বা ফাঁদ পেতে ধরে নিয়ে যায় এই ভয়ে ওরা আল্লাহর নাম জপতে থাকে। রাতে যেন সহি সালামতে বাসায় ফিরতে পারে এ জন্য দোয়াও করে কাঁকড়া।
সেদিনকার ঘটনা। ভোর কাঁটায় কাঁটায় সাতটা। জংলী মেয়েরা দল বেঁধে এসেছে খালে। খালে পানি বেশি নেই কিন্তু পলি অনেক। জাল দিয়ে ওরা মাছ, কাঁকড়া ধরতে শুরু করেছে। প্রত্যেকেরই হাঁটু পর্যন্ত দেবে গেছে পলিতে, এর উপর হাজা-মজা পানি। বেশ বিচ্ছিরি অবস্থা। যুবতী মেয়েদের দৌড় ঝাঁপে সাত সকালে এলাকাটা মুখর হয়ে উঠল। হঠাৎ এক মিশমিশে কালো যুবতী মেয়ের ইশারায় সবাই চুপ হয়ে গেল। এখান থেকে প্রায় ত্রিশ চল্লিশ গজ দূরে রয়েল বেঙ্গল টাইগার দাঁড়িয়ে। মেয়েটির অঙ্গুলি নির্দেশে জাল ফেলে সবাই তড়িঘড়ি উঠে এলো খালের পারে। কালো মেয়েটির নাম পরী। ও ইশারায় সবাইকে একটা বড় গাছের আড়ালে নিয়ে এলো। বাঘ মামা এদিক ওদিক তাকিয়ে খালে নামলো। দূর থেকে ওরা দেখলো বাঘ খাল পেরিয়ে অন্য বনে অদৃশ্য হয়ে গেলো। জংলী মেয়েরা সেদিন সবকিছু ফেলে বাড়ি ফিরলো। কয়েকদিন আর ওমুখো হলো না।
বেশ ক’দিন পর। কাঁকড়া ভোরে রোদ পোহাতে সেই সুন্দরী গাছের কাছে গেলো। তখন মাকড়সা জেগেছিল। কাঁকড়া বেশ খেয়াল করে দেখলো ওর আকার বেশ বড় হয়েছে। জালের মাঝ বরাবর মাকড়সাটি বেশ জায়গা জুড়ে অবস্থান নিয়েছে। কাঁকড়া ডাকলো মাকড় ভাই, জেগে আছো নাকি।
হ্যাঁ কাঁকড়া ভাই। জেগেই আছি। বেশ ক’দিন আমাদের দেখা হয়নি, তাই না?
-হ্যাঁ, মাকড় ভাই। জংলী মেয়েদের ভয়ে খালের ওপাড়ে চলে গিয়েছিলাম। তবে এখন সুখবর আছে।
-সে সুখবরটা কী?
-বলছি, মাকড় ভাই বলছি। সেদিন জংলী মেয়েদের একটি আমাকে জালে বন্দী করে ফেলেছিলো। আমিতো চিন্তায় অস্থির। এখনই আমাকে ধরে খলুইয়ে রাখবে। ভয়ে চোখ বন্ধ করে চিন্তা করছি কী করা যায়? মনে মনে ভাবলাম যে, যদি সে আমাকে হাত দিয়ে ধরে তাহলে বড় চ্যাপ্টা পা খানার চিমটা বসিয়ে দেব ওর হাতে। আর যদি সে চিমটার জালা সহ্য করতে না পারে তাহলে আমাকে ছাড়তে বাধ্য হবে- তখন পালিয়ে বাঁচবো। এই যখন চিন্তা করছি তখন বাঘ মামা উপস্থিত সেখানে। বাঘের উপস্থিতি টের পেয়ে সবাই জাল-খলুই ফেলে বনের ভিতর ভেগেছে। এই ফাঁকে বেরুতে যাবো; অমনি বাধ সাধলো অন্য কাঁকড়া। জাল থেকে বেরোতে গেলেই সে আমার পাটা শক্ত করে ধরল। আর বলল- আমাকে নিয়ে যা….। আমি নিজেই জাল কেটে বের হতে পরছি না-অন্য দিকে ও আমাকে বেরুতে দিচ্ছে না। পড়লাম উভয় সংকটে। আমি তখনও পানিতে ডুবে আর আমার সাথী কাঁকড়া উঠেছে জালের কোরার উপর কিন্তু ওর পা আটকে আছে জালে। হঠাৎ একটা ক্ষুদে চিল এসে আমার সাথী কাঁকড়াকে ছোঁ মেরে অদৃশ্য হয়ে গেল। এই সুযোগে আমি আস্তে আস্তে জাল কেটে বেরিয়ে এলাম।
-মাকড়সা একনাগাড়ে কাহিনীটা শুনছিলো। হঠাৎ সুযোগ পেয়ে জিজ্ঞেস করল তারপর…….
কাঁকড়া একটু সময় নিয়ে বলল- মাকড় ভাই, এখন একটু ভালোই আছি। জংলী মেয়েরাও বাঘের ভয়ে এদিকে আসছে না। তাই এখন ভয়হীনভাবে শিকার ধরে খাচ্ছি। মাকড়সা বলল- শুনে খুশি হলাম- কাঁকড়া ভাই। এখন প্রতিদিনই এসো এখানে। দু’জনে গল্প করবো।
একদিন সকালে কাঁকড়া এসে মাকড়সাকে দেখলো কাতরাচ্ছে যেন। ডাক দিয়ে বলল-মাকড় ভাই কী হয়েছে? কাঁদছো কেন? মাকড় কাতর কন্ঠে বলল- বিপদ- খুব বিপদ।
-কী হয়েছে খুলে বলো ….
– আরে কাঁকড়া ভাই অনেক কষ্ট করে ডিম ফুটিয়ে বাচ্চা বের করেছি। এখন ওরা আমাকে ঘিরে ধরেছে।
– কেন ঘিরে ধরেছে?
– আমাকে খাবে বলে।
– তোমাকে খাবে কেন?
– ওদের পর্যাপ্ত খাবার দিতে পারছি না। তাই যারা খেতে পায় না আমার বুকটা খেতে শুরু করেছে। দেখো না সামনটা কীভাবে ঝাঁঝরা করে ফেলেছে। কাঁকড়া ভাই আমি মনে হয় আর বাঁচবো না। আমার সন্তানেরাই আমাকে খেয়ে ফেলবে।
কাঁকড়া একটু সময় নিয়ে দুঃখের সাথে বলল-মাকড় ভাই বিষয়টি সত্যিই আমাকে ব্যথিত করছে। তবে একটা জিনিস না বলে পারছি না, সেটা হলো তোমার অজ¯্র ডিম উৎপাদন। যদি ডিমের সংখ্যা সীমিত হতো তাহলে বাচ্চাও সীমিত হতো। আর তখন তুমি ওদের খাওয়াতে পারতে। এখন তোমার বাচ্চারাই তোমাকে এ পৃথিবীতে বাঁচতে দিচ্ছে না।
– আমার ভুল হয়েছে কাঁকড়া ভাই। এই দুনিয়াতে হিসাব নিকাশ করেই চলা উচিত। যদি আয় বুঝে চলতাম তাহলে আজ সন্তানদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হতাম না।
– কাঁকড়া বলল- এক কাজ করি মাকড় ভাই?
– সেটা কী?
– তোমার অর্ধেক বাচ্চা মেরে ফেলি?
– না কাঁকড়া ভাই, তা হয় না। ওরা আমার বুক খেয়েও যদি বেঁচে থাকে, তবেই আমার জীবন স্বার্থক হবে?
– কাঁকড়া বলল- ঠিক আছে বন্ধু। তোমার ইচ্ছাই পূর্ণ হউক। দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে কাঁকড়া-মাকড়ের কাছ থেকে শেষ বিদায় নিতে ভুললো না ……।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close