ফিচার

ইলিশ

জুঁই ইসলাম:

রহমত আলির হাতে দু‘টো বড় ইলিশ মাছ। এক হাতে মাছ আর অন্য হাতে সিগারেট টানছে আর নীল আকাশের নীচে খুশি মনে হাঁটছে। মনটা খুব ফুরফুরা। অনেকদিন পর তার মন আজ ভালো। ছোট মেয়েকে ইলিশ দেখাতে বা খাওয়াতে পারবে বলে।
রহমত আলি একজন পাহারাদার। মাসে বেতন ছয় পান হাজার। ঘর ভাড়া দেন তিন হাজার। তিনজন ছেলে মেয়ে নিয়ে থাকেন একটা বস্তিতে। কোন মতে সংসার চালান। বেশির ভাগ সময়ই ডাল ভাত ছোট মাছও জোটে না আর বড় মাছ তাও ইলিশ। খুশি হবেন না ? সেই কবে ইলিশ খেয়েছেন মনেও নাই। রহমত আলি মনে করার চেষ্টা করছেন কিন্তু মনে আসছে না। কিন্তু ইলিশের ঘ্রান তিনি রোজই পান। কারন তিনি যে বিল্ডিং-এ কাজ করেন সেখানে সব বড় লোকেরা থাকেন। তারা কত মজার মজার রান্না করেন রহমত আলি সে রান্নার ঘ্রান রোজই পান। কিন্তু খাওয়া আর হয় না। তারা যখন দুপুরে খান তখন রহমত আলি লাটি নিয়ে গেইটে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। যাতে ভেতরে কোন বড় বিড়ালছানাও ঢুকতে না পারে।
ছোট্ট মেয়েটা রোজ বলে বাবা ইলিশ খাবো, বইয়ে পড়েছি ইলিশ মাছ আমাদের জাতীয় মাছ। যখন থেকে রহমত আলি ছোট্ট মেয়েটাকে অক্ষর চেনার বই কিনে দিয়েছেন সেই থেকে মেয়েটা ইলিশ মাছের ছবি দেখে আর বাবাকে বলে, বাবা ইলিশ খাবো, ইলিশ আনবেন কবে ? শুধু ছবি দেখছি বইয়ে ইলিশ মাছের, কিন্তু ঘরে তো কোনদিন এই মাছ দেখিনি বাবা। রহমত মেয়েকে সান্তনা দেয় জাতীয় মাছ বড় লোকদের জন্য। গরীবদের জাতীয় মাছ হচ্ছে ছোট মাছ। বড় লোকেরা বই বানায় তো তাই তাদের মতো বই সাজায়। যে দেশে দু‘বেলা টিক মতো ভাত খেতে পারে না গরীবরা সেখানে ইলিশ জাতীয় মাছ হয় কিভাবে? রহমত আলি মনে মনে এসব বলে আর কষ্ট পায় মেয়েকে সামান্য একটা ইলিশ মাছ খাওয়াতে পারে না। যে বাবা বাচ্ছার সামান্য আবদার পূরন করতে পারে না তার বাবা হওয়া উচিত না। নিজেকে ধিক্কার আর হতভাগা বলেই মনোকষ্ট নিয়ে রহমত আলি মেয়ের এসব কথা এড়িয়ে চলেন।
রহমত মাছ নিয়ে ঘরের সামনে আসা মাত্র মেয়েটা দৌড়ে বাবার কাছে এলো। বাবা তোমার হাতে কি আছে? ছেলে দু‘জনও কাছে এলো। বাবা থলিতে কী? রহমত হাসি মুখে বলে ইলিশ মাছ। সবাই খুব খুশি। ছোট মেয়েটা বলে বাবা সেদিন যে কইলেন এটা বড় লোকের মাছ! আমরা কী আজ বড় লোক? রহমত হাসিমুখে বলে ধর মা আজ আমরা বড় লোক !
রহমত তার বউকে বলে ভালো করে রান্না করতে। বউ জিজ্ঞেস করে এত বড় মাছ টাকা কই পাইলেন? আল্লাহ দিছেন বউ।
আল্লাহ তো আকাশ থেকে আপনাকে দেন নাই আর আমি তো জানি যেখানে সামান্য মাছ কিনতে পারি না সেখানে………………..
রহমত উত্তর দেয় এক বড় লোক স্বপ্ন দেখছেন তাঁর মৃতঃ মাকে বড় ইলিশ মাছ খাওয়াচ্ছেন।
ভদ্রলোকের মা এক মাস হলো মারা গেছেন তাই
তিনি বাজার থেকে বড় ইলিশ কিনে এনে আমাকে দিয়ে গেলেন। বড়লোকদের স্বপ্নও পুরন হয় আর আমাদের মত সামান্য বেতনের লোকদের নেয্য দাবি বা স্বপ্নও পূরণ হয় না
কথাগুলো বলে রহমত বউকে বলে ভালো করে রান্না করতে।
রহমত গোসল শেষ করে টিভিতে খবর ধরলো বিটিভি-তে ১০ মিনিট খবর দেখে তার মিজাজ হলো খারাপ, দেশে শুধু উন্নয়নের জোয়ার আর জোয়ার আর কোন সংবাদ নাই। জিনিষপত্রের কি দাম? মানুষ হিমশিম খাচ্ছে সংসার চালাতে আর বিটিভির খবরে শুধু উন্নয়নের জোয়ার, দেশে নাকি গরীব নাই, সবাই এখন খুব ভালো আছে, দৈন্যতা দূর হয়েছে। কি ডাহা মিথ্যে কথা বলে এই চ্যানেলগুলো- রহমত জানে তার পরিবার চালাতে কী কষ্ট করতে হয় ? টিকমতো ডাল ভাত খেতে পারে না, কারো কাছে হাতও পাততে পারে না। তিন ছেলে মেয়ে নিয়ে চলা খুব কষ্ট। আর ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া করানো অসম্ভব কল্পনামাত্র। ভাবছে বড় ছেলে দু’জনকে এতিম খানায় দিয়ে দিবে। বাপ-মা থাকতে এতিম খানায় কী করার আছে? ওদের ভবিষ্যৎতের কথা ভাবতে হবে। মানুষ করতে হবে। সামান্য কয়টা টাকা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন। রহমত সিগারেট টানছে বেশ জোরে জোরে টেনশন হচ্ছে খুব। এ মাসের ঘরের ভাড়া বাকি। কি করবে ? বুঝে উঠতে পারছে না।
দীর্ঘশ্বাস ফেলছে! ছোট্ট মেয়ে দৌড়ে এসে বাবা ! বাবা !
আজ আমাদের ঈদের দিন। কেন মা ?
কেন আবার ?
আজ ইলিশ খাব তাই! ঘ্রান পাচ্ছ না বাবা ? মা ইলিশ ভাজছেন ! কি মজার ঘ্রান তাই না বাবা ? সামান্য দু‘টো ইলিশ মাছ আর মেয়েটা কতটা খুশী। আর খুশী হবে না কেন কতদিন বইয়ের ছবি দেখে বাবাকে বলেছে ইলিশ আনতে। জাতীয় মাছ খাওয়ার কথা বলেছে কিন্তু রহমতের যা আয় তা দিয়ে সামান্য ছোট মাছ কিনতে হিমশিম খায়। গরীররা সামান্যতে কত খুশী হয় আর বড় লোকদের সহজে খুশি করানো যায় না। মেয়েটা মুখের হাসি দেখে রহমতের চোখে পানি এসে গেলো।
ও ঘর থেকে রহমতের বউ ডাকছে কই আসো গো খাবে। মেয়ে আর রহমত খেতে বসল। সাথে ছেলে দুজনও।
সবার মুখে হাসির ঝিলিক-রহমত আলী মনে মনে ভাবেন দুটো ইলিশ মাছ পেয়ে বাচ্চারা কত না খুশী , মেয়েটা তো বার বার ইলিশ মাছ হাতে নিয়ে বলছে আজ ঈদের দিন। সামান্য দুটো মাছেই গরীবদের ঈদ হয় আর বড় লোকদের ৫০ লক্ষ টাকার গাড়ি কিনেও হয়ত এরকম খুশী হয় না।
বৈশাখের প্রথমদিন ইলিশের চাহিদা অনেক গুণ থাকায় টাকাওয়ালা মানুষরা ইলিশ কিনে ফ্রিজে ভরে রাখেন, নিজেদের পেট ভরেন, আর গরীবরা শুধু আশ-পাশ থেকে ঘ্রান নেন। রহমত আলী এসব ভাবেন আর কষ্টে পেয়ে মুখে ভাত তুলেন।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close