ধর্ম

মাহে রমজানের রোজা পালন ও এর পূর্ববর্তী ইবাদত

সাদিয়া চৌধুরী পরাগ : জগতে প্রতিটি ধর্ম মহান সৃষ্টিকর্তার নির্দেশে আবর্তিত হয়েছে। এবং সকল সৃষ্টি কল্যাণের নিমিত্ত মানব সমাজে প্রচলিত ও নির্দ্ধারিত করা হয়েছে। এ সম্পর্কে স্বয়ং আল্লাহপাক বলেছেন, আমি প্রতিটি জাতি বা কওমের মাঝে ঐশী দূত অর্থাৎ নবী বা পয়গম্বর কিংবা অবতার প্রেরণ করে তাঁদের মাধ্যমে আমার বাণী প্রেরণ করেছি। যা দ্বারা মানুষ বিশেষ জ্ঞান লাভ করে ও সমগ্র সৃষ্টির উন্নতি সাধন করে।
পৃথিবীর প্রথম মানব-মানবী হযরত আদম (আঃ সাঃ) ও বিবি হাওয়া (আঃ সাঃ) মাটির গ্রহে আগমনের পরে ও তাঁদের বংশবৃদ্ধি হওয়ার শুরু থেকে মহান প্রতিপালক আল্লাহতায়ালা, আদম (আঃ সাঃ) উপর আসমানী গ্রন্থ সহিফা নাজেল করেন। যা দ্বারা আদমের বংশধরেরা বিভ্রান্তিকর পথে পরিচালিত হতে না পারে এবং পৃথিবীতে বসবাস উপযোগী রীতিনীতি গ্রহণ করে। এবং এভাবেই পরম করুণাময় আল্লাহ পরবর্তী যুগ সমূহে তাঁর বিশেষ দূত বা নবীদেরে এ জগতে প্রেরণ করেছেন, সকল সৃষ্টির উন্নয়ন প্রকল্পে এবং মানুষ যেনো অভিশপ্ত ইবলিসের দুষ্কর্ম ও প্ররোচনার হাত থেকে দূরে থাকতে পারে।
প্রথম নবী হযরত আদম (আঃ সাঃ) থেকে শুরু করে মানব সমাজে ১লাখ ২৪ হাজার নবী রসুল ও পয়গম্বরগণ এ পৃথিবীতে অবতীর্ন হয়েছেন আল্লাহর হেদায়তের বাণী প্রচারের জন্যে এবং তাঁদের মঙ্গল প্রসূত বাণী সমাজ সংসারে গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য সভ্যতা এগিয়ে গিয়েছে। কিন্তু হযরত ঈসা রুহ উল্লাহ আল্লাহর নবী রূপে পৃৃথিবীতে আবির্ভূত হওয়ার পাঁচশত বৎসর অতিবাহিত হওয়ার পরে মহানবী ও জগৎ শ্রেষ্ঠ মানুষ নবী করিম (সাঃ) আল্লাহ তালার একান্ত অনুগ্রহে এ বিশ্বে অবতীর্ণ হন। কিন্তু খুবই বিস্ময়কর বিষয় যে, যাকে খোদাতালা প্রথম মানবরূপে সৃষ্টি করে তাঁর আরশ মহল্লায় কোটি কোটি বৎসর একান্ত কাছে রেখে সময় অতিবাহিত করেন তাঁকেই আখেরী নবী করে দুনিয়াতে প্রেরণ করেন তাঁর হেদায়তের বাণী দিয়ে এবং ঘোষণা করেন, এরপর নবী রসুল ও পয়গম্বরগণ আসার পথ রোধ করে দেওয়া হল।
নবী করিম (সাঃ) এর আবির্ভাব ও নবুওত প্রাপ্তির পর এক সময় তিনি উর্দ্ধাকাশ ভ্রমণ করেন। প্রকৃতপক্ষে বিষয়টি মহান ¯্রষ্টার ইচ্ছায় সংঘটিত হয়েছিল, রজব মাসের সাতাশ তারিখে। তাই সে রাত্রি ও দিন মুসলিম উম্মাহর কাছে অতি প্রিয় ও পবিত্র। কারণ অন্য কোনও জাতির পক্ষ থেকে কোনও নবী রসুলের সৌভাগ্য ঘটেনি এরূপ উর্দ্ধাকাশ ভ্রমণ করার। বস্তুতঃ নবী করিম (সাঃ) সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহর দাওয়াত গ্রহণ করতেই গিয়েছিলেন। সেখানে পৌঁছে আরশ মহল্লায় বসে আল্লাহ ও আল্লাহর প্রিয়তম দোস্ত আলাপ আলোচনার মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর জন্যে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাযের পরিবর্তে পাঁচ ওয়াক্ত নামায ও ছয়মাস রোজা রাখার বদলে একমাস রোজা পালন ফরজ কর্মের অন্তর্ভূক্তি করে অনুমতি নিয়ে আসেন। বস্তুতঃ নামায রোজা হজ্ব ও যাকাত আদায় করা ইসলাম ধর্মে অবশ্য করণীয় বিষয়। এগুলো পালনের মাধ্যমে ঈমান দৃঢ়-পুষ্ঠ হতে থাকে। মানুষ আল্লাহর অনুগ্রহ লাভের সুযোগ পেয়ে থাকে।
অনেক বিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব বিশেষ মনে করেন যে, রসুল করিম (সাঃ) এর মেরাজ শরীফ যাওয়া বা উর্দ্ধাকাশ পরিভ্রমণ করা তাঁর স্বপ্নযোগেই ঘটে। কারণ পৃথিবী থেকে লক্ষ লক্ষ আলোক বর্ষ দূরে কোথাও কারো যাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু যে মানব সন্তান জীবনে কখনো কোনও মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করেননি যাকে ইসলাম অনুরাগী ও অবিশ্বাসি পর্যন্ত আল-আমিন বা পরম সত্যবাদী বলে বিশ্বাস করেছে, তার কথা সত্য হবে না এ মেনে নেওয়া যায়না। তাছাড়া পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক আইনস্টাইনের ‘থিত্তরি অব রিলেটিভিটি’ তত্ত্বকে বিশেষ বিশ্লেষণ করতে গেলে এর সত্যতা সম্পর্কে সন্দ্বিহানের অবকাশ থাকেনা তাছাড়া এই মেরাজ সম্পর্কে পবিত্র কোরআন মজিদে বর্ণনা রয়েছে।
মেরাজের পরবর্তী দু’সপ্তাহ বা পনেরো দিনের মধ্যে অর্থাৎ ১৪ই শাবান দিবাগত রাত একটি পবিত্র রজনী বলে অনেক পূর্ব থেকে প্রচলন হয়েছে। পবিত্র রমজান আগমনের পনেরো দিন পূর্বে পবিত্র রাত্রির আগমন ঘটে। তবে এই রাত্রি আগমনের কথা পবিত্র কোরআনুল কারিমে উল্লেখ না থাকলেও পুরানো বা যয়িফ হাদিসে রয়েছে, একদা নবী করিম (সাঃ) বিবি আয়েশা সিদ্দিকার গৃহে অবস্থান করছিলেন। হয়ত বা তিনি ঘুমিয়েও পড়েছিলেন। হঠাৎ জেগে ওঠে তিনি বিবি আয়েশা সিদ্দিকা (রাঃ) কে বলে ওঠলেন, হে হোমায়েরা! তুমি কী জানো এ কোন রজনী? হযরত আয়শা (রাঃ)র পক্ষ থেকে জবাব আসে, তা আল্লাহ এবং আল্লাহর রসুল (সাঃ) ভালো জানেন। এরপরই দেখা যায় রসুল পাক (সাঃ) ওজু পড়ে ঘর থেকে বের হয়ে জান্নাতুল বাকী, ফিরে যান এবং ফজরের নামাযের পূর্ব পর্যন্ত কবরবাসীর জন্যে দোয়া কালাম পাঠ করতে থাকেন।
এছাড়া অন্যভাবে অপর একটি কথা বা কিংবদন্তি শোনা যায়, এ রাতে রসুল করিম (সাঃ) দাঁতের যন্ত্রণা অনুভব করছিলেন। কথাটি শোনে বিবি ফাতিমা (রাঃ) তাঁর আব্বাজানের জন্যে হালুয়া রুটি তৈরী করে বাতি জ্বালিয়ে নিজ গৃহ থেকে পিতার ঘরে এসে এই হালুয়া রুটি পরিবেশন করেন। সে জন্যে শাবানের চান্দকে অনেকে বাতি বা চেরাগের চান্দ বলে আখ্যায়িত করে।
যেহেতু শাবান মাসের এ রাত সম্পর্কে কোরআন শরীফে কোনও উল্লেখ নেই সেজন্যে এ রাতকে এবাদতের রাত বলে অনেকে মেনে নিতে চায় না। কিন্তু প্রশ্ন হলো এ রাতে হালুয়া রুটি তৈরী করে গরিব মিসকিন কিংবা আত্মীয়-স্বজনকে দান ও আদান-প্রদান করা তো দূষণীয় কিছু নয়। বরং নির্মল আনন্দের বিষয়। মানুষে-মানুষে বন্ধন গড়ে ওঠার এ যেন সেতু পথ। এটাও তো আল্লাহতায়ালার খুশীর বিষয় অন্যরকম নেয়ামত। তাছাড়া নফল ইবাদত করা অর্থাৎ নামায, রোজা পালন করার মধ্যেও অশোভীয় কিছু প্রকাশ হয় না। বরং আল্লাহকে খুশী করার নিমিত্ত এই আয়োজনের প্রকাশ ঘটে। সুতরাং এই দিনগুলোর সৌন্দর্য্য ম্লান করা উচিৎ হয়না। বরং এতে নফল এবাদত করার উচ্ছ্বলতা ম্লান হয়ে যায়। এতে দ্বিমত পোষণ করার অবকাশ নেই। ফরজ রোজা পালন করা প্রতিটি মুসলিম উম্মাহর অবশ্য করণীয় বিষয়। যা অমান্য করলে খোদার আইন লঙ্ঘন করা হয়। কিন্তু রোজার কিছুদিন পূর্বে নিয়ম করে সম্মিলিতভাবে মুসলমান সমাজ যে নফল রোজা ও নামাজ পড়ে গরিবদের দান খয়রাত করে এতে খোদা খুশী হাসিল হয়।
লেখক : প্রাবন্ধিক।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close