ফিচার

সেকালের সেহরি-ইফতারি

আবদুল হামিদ মানিক : আবহমান বাংলায় সকল ধর্মের লোক পাশাপাশি বসবাস করে আসছে। সকল ধর্মের আছে আচার-অনুষ্ঠান-উৎসব আয়োজন। মুসলমান জনগোষ্ঠির উৎসবের বাইরে পবিত্র রমজান মাস আসে বিশেষ আবেদন নিয়ে। ইসলামের মূল পাঁচটি স্তম্ভের একটি হচ্ছে রমজান মাসে রোজা পালন। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে সমগ্র মাস মুসলিম নরনারী সূর্যোদয়ের পূর্ব হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থাকেন। যুগ যুগ ধরে রমজান মাস পায় আলাদা গুরুত্ব। এভাবে আমাদের সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে গেছে এক মাসের আচার-অনুষ্ঠান।
রমজান মাস শুরুর আগেই ঘরে ঘরে লক্ষ করা যেত প্রস্তুতি। বাড়তি কিছু পণ্য কেনাকাটা হতো। প্রধানত খাদ্যপণ্য। মহিলাদের মধ্যেই তোড়জোড় হতো বেশি। কারণ বিশেষ খাবার তৈরির দায়িত্ব তাদের। আমাদের পরিবারে দেখেছি, পনেরো কুড়ি দিন আগেই পাকা বড় বড় কুমড়া ফালি ফালি করে বাঁশের কঞ্চির টুকরো দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মা-দাদি রেডি করতেন। মোরব্বা তৈরি হবে। সমস্ত মাসে সেহরিতে ছিল দুধের সঙ্গে মোরব্বার যোগ। তৈরি করে ঘরে মা লুকিয়ে রাখতেন যেন অসময়ে চুরি করে আমরা ভাইবোনেরা সাবাড় করে দিতে না পারি। এভাবে এগিয়ে আসত রমজানের চাঁদ দেখার দিন। বাড়ির মসজিদের মিনারে উঠে অনেকে আকাশের দিকে তাকাতেন। মাগরিবের নামাজ পড়তে আসা সকলের চোখ আসমানের দিকে। চাঁদ দেখা গেলে নামাজ শেষে ঘন্টা বাজানো হতো। স্কুলের কাসার ঘন্টার মতো ঘণ্টা, শক্ত কাঠের হাতুড়ির মতো দ-। ঘন্টা পেটানোর শখ কিশোরদের ছিল প্রবল। চাঁদ দেখা না গেলেই বিপত্তি। ওরা খোজখবর নিতেন। বিতর্ক জমে যেত। এভাবে শুরু হতো রমজান।
তারাবির নামাজ পড়ানোর জন্য রমজানে আসতেন হাফিজ সাহেব। জামাতে জড়ো হতেন পাড়ার প্রচুর লোক। সেহরির সময় ঘন্টা বাজাতেন কেউ। এটি থাকত ইমাম সাহেবের জিম্মায়। তখন মাইক্রোফোন গ্রামের কোনো মসজিদেই ছিল না। ঘন্টাও সকল গ্রাম বা মসজিদের ছিল না। ঘড়ির প্রচলনও ছিল কম। প্রবীণ মহিলারা বিশেষ পাখি সম্ভবত প্যাঁচার ডাকে রাতে সময় আন্দাজ করতেন। পাখিটি নাকি ডেকে প্রহর ঘোষণা করে। ফ্যাঁচকুনা বা ফিঙের ডাকেরও ছিল বিশেষ কদর। মোরগার বাঁক (ডাক) ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। খাবার সময় কানখাড়া। আজান শুনলেই সঙ্গে সঙ্গে খাবার বন্ধ। গ্রামে এভাবে সেহরি খেতেন সবাই।
রমজান মাসে প্রতিটি মুসলিম পরিবারের দৈনিক রুটিন বদলে যায়। দিনের বেলা খাবার আয়োজন নেই। ঘরে ঘরে ইফতার সামগ্রী তৈরির জন্য বাড়তি কিছু পণ্য রাখা হয়। ছোলা, মুড়ি, ডাল, খেচুড়ি ফলমূলের সঙ্গে থাকে শরবত, পিঁয়াজি, চানা বা ছোলা, বেগুনি, বাখরখানি, জিলাপিসহ নানা রকম খাবার তৈরি হয় ইফতারের জন্য। শিশুরা রোজা রাখে না কিন্তু ঘরে ব্যতিক্রমী খাবার তৈরি হওয়াতে তারাও আনন্দিত হয়। ইফতারের সময়ের জন্য রোজাদাররা থাকেন অপেক্ষায়। কখন আজান হবে অথবা বাজবে সাইরেন। কানখাড়া করে ইফতার সামগ্রী সামনে রেখে অপেক্ষার মুহূর্তটি দারুণ আনন্দের। ইফতারের সময় ঘোষণার জন্য এ যুগে শহরে বাজানো হয় সাইরেন। প্রশাসনও এ ব্যবস্থা নেয়। আবার অনেক মসজিদ কর্তৃপক্ষও সাইরেন রাখেন। অতীতে গ্রামে বাজানো হতো ঘণ্টা। ইফতার ও সেহরির সময় ঘণ্টা অথবা সাইরেনের শব্দ ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। শেষ রাতে সেহরির সময় শিশুরাও কোনো রকম ঘুম ভেঙে গেলে খানায় শরিক হয়। তাদের জন্য অসময়ে বড়দের সঙ্গে খাবার স্বাদই আলাদা। দিনের বেলা পানাহার নেই। তাই সবাই সেহরি ও ইফতারিতে সাধ্যমতো ভালো খাবার রাখেন। বিশেষ করে ইফতার সামগ্রী এবং ইফতারি আমাদের সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে উঠেছে।
রোজাদারকে ইফতার করানো সওয়াবের কাজ। বাড়ির মসজিদে এবং বাঁধানো পুকুর ঘাটে আশপাশের অনেকে এসে ইফতারের আগে জড়ো হতেন। বাড়ি থেকে পালাক্রমে ঘাটে ইফতারি পাঠানো হতো। কেউ কেউ নিজের ঘরের তৈরি দু’একটি আইটেম নিয়ে আসতেন। গল্পগুজব চলত। আমরা কিশোররা ঘণ্টা হাতে ইমাম সাহেবের দিকে তাকিয়ে। সময় হতেই উল্লাসে সমস্ত শক্তি দিয়ে ঘণ্টা পেটানো শুরু। বাহির বাড়ি থেকে একেবারে ভেতরে উঠোন পর্যন্ত হেঁটে হেঁটে ঘন্টা বাজিয়ে পেতাম দারুণ মজা। সেই সঙ্গে ইফতার সামগ্রীর স্বাদ।
রমজান মাসে বাজারে বিচিত্র ইফতার সামগ্রীর দোকান বসে। শুধু এক মাসের জন্য এসব দোকানে বিকেল থেকে ক্রেতার ভিড় দেখা যায়। বেকার যুবকরাও মাঝে মাঝে যৌথভাবে ইফতারির দোকান খোলে পিয়াজু, সমুচা, বাখরখানি, ছোলা, বেগুনি, জিলাপি, নিমকি, মিষ্টি, খেজুর প্রচুর বেচাকেনা হয়। আজকাল চমৎকার প্যাকেটেও ইফতার সামগ্রী বিক্রি হয়। অতীতে সেমাই, ফিরনি, ছোলা, পিয়াজু, জাউ ছিল প্রধান ইফতার সামগ্রী। এখন ফাস্টফুডের যুগে নানা রকম আইটেম যোগ হয়েছে।
ইফতারি নিয়ে কোনো কোনো অঞ্চলে বিশেষ করে সিলেট বিভাগে একটি সামাজিক রেওয়াজ গড়ে উঠেছে। মেয়ের শ্বশুরবাড়ি পাঠাতে হয় ইফতারি। নতুন বিয়ে হলে তো কথাই নেই, প্রথম রোজাতেই ইফতারি পাঠাতে হয়। বেয়াই বেয়াইন অপেক্ষায় থাকেন। ঘাটতি হলে মুখ ঝামটা দিতে কসুর করেন না। বিয়ের পর প্রথম ইফতারি খুব গুরুত্বের সঙ্গে দেয়া হয়। জামাই বন্ধুবান্ধব আত্মীয়স্বজনদের দাওয়াত দেন। সবাই মিলে ইফতার করেন। উভয়পক্ষের মুখ উজ্জ্বল হয়। আজকাল এটিই বড় আকারে ইফতার মাহফিলের সংস্কৃতি হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আয়োজন করে ইফতার মাহফিলের। রাজনৈতিক দলগুলোও ইফতার পার্টি দেয়।
মুসলিম দেশগুলোতে শহর এবং গ্রামীণ হাটবাজারে চা-স্টল, খাবার হোটেল রেস্তোরাঁ দিনের বেলা বন্ধ থাকে। রাতে জমজমাট হয়ে ওঠে। কোনো কোনো দেশে সমগ্র রমজান মাস তারাবিহ নামাজের পর লোকজন ঘুমায় না। সেহরি খেয়ে ফজরের নামাজ শেষে ঘুম। দিনের বেলা থাকে ছুটির আমেজ।
রমজানে ইফতারির সময়ে সবচেয়ে বেশি প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যায়। রহমত, বরকত ও ইবাদতের মাসটির চরম আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে ঈদুল ফিতর। রমজান বিদায়। বিদায়ের বেদনা নিয়ে আবার রমজানের জন্য শুরু হয় অপেক্ষা।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close