ধর্ম

ঈদুল ফিতর ও আমাদের করণীয়

মোশাররফ হোসেন সুজাতঃ:

মুসলিম জাতির দু’টি আনন্দ-উৎসবের প্রধান উৎসব হলো ঈদুল ফিতর। এ দিনে মুসলিমগণ সুন্দর ও পবিত্র পোশাকে সজ্জিত হয়ে ঈদগাহে যান। সবাই মিলে একসাথে ঈদের সালাত আদায় করেন। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশি, গরিব-মিসকীন নির্বিশেষে সকলে এক সাথে ঈদের আনন্দ ভাগ করেন।

কথা হলো আমাদের এ দিনে কোন ধরনের বা কিভাবে আনন্দ উল্লাস করা উচিত?

এ দিনে অনেক মুসলিম ভাই বোনেরা এমনও সব অনৈসলামিক কার্যকলাপ ও বিজাতীয় সংস্কৃতি পালনে মেতে ওঠেন যা ইসলাম কখনই অনুমোদন করে না। ঈদের দিন আমরা হিন্দি বাংলা সিরিয়াল নিয়ে ব্যস্ত হই। প্রেমিক প্রেমিকা নিয়ে ঘুরাঘুরি করি, পাড়া মহল্লার মুড়ে মুড়ে বসে অহেতুক আড্ডাবাজি করি, হলে গিয়ে সিনেমা দেখি আর নাচ গান হৈ-হুল্লোড়কে ঈদের আনন্দ বা সংস্কৃতি মনে করি।

অথচ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা থেকে হিজরত করে মদীনায় গেলেন। তিনি মদীনাবাসীকে ফার্সিক প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে বসন্তের পূর্ণিমা রজনীতে ‘মেহেরজান’ আর হেমন্তের পূর্ণিমা রজনীতে ‘নাওরোজ’ নামক উৎসবে এমন সব আমোদ প্রমোদে মেতে ওঠতে দেখলেন যা সুস্থ বিবেকের কাছে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। তিনি মদীনাবাসীকে ডেকে বললেন, এ বিশেষ দিনে তোমাদের আনন্দ-উল্লাসের কারণ কি? মদীনার নওমুসলিমগণ বললেন, আমরা জাহিলী যুগ হতে এ দু’টি দিন এভাবেই পালন করে আসছি।

মহানবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘‘আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা এ দু’টি দিনের পরিবর্তে অন্য দু’টি দিন তোমাদের উৎসব করার জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন। তার একটি হল ‘ঈদুল ফিতর’, অন্যটি ‘ঈদুল আযহা’। তোমরা পবিত্রতার সাথে এ দু’টি দিনে উৎসব পালন করবে। [আবু দাউদ ও নাসায়ী]।

ইসলামের ইতিহাসের দিকে ২য় হিজরীর রমযান মাস প্রায় শেষ হতে চলেছে। আর মাত্র দু’দিন বাকি। ওহী নাযিল হল: ‘‘নিশ্চয় সে ব্যক্তি সাফল্য অর্জন করেছে, যে আত্মিক পরিশুদ্ধতা অর্জন করেছে এবং তার পালন কর্তার নাম স্মরণ করেছে। অতঃপর সালাত আদায় করেছে। [সূরা আ’লা: ১৪-১৫]।
আহকামুল কুরআনে বলা হয়েছে: ‘‘এখানে সালাত আদায় করা দ্বারা ঈদুল ফিতরের সালাত আদায়ের কথা বলা হয়েছে। [আহকামুল কুরআন: ৩য় খন্ড, পৃ ৪৭৫]।

দ্বিতীয় হিজরী হতে মুসলিম উম্মাহ যথারীতি প্রতি বছর ঈদুল ফিতর পালন করে আসছে।

ঈদুল ফিতর কি?
ঈদ অর্থ: উৎসব, পর্ব, আনন্দ। আর ফিতর অর্থ: ফাটল, চির, ভাঙন, ভাঙা। এ দিক হতে ঈদুল ফিতর অর্থ হলো: রোযা ভাঙার পর্ব বা উৎসব। দীর্ঘ এক মাস রোজা রাখার পর আল্লাহর নির্দেশে আমরা এ দিনে রোজা ভাঙা বলে এ দিনটির নাম ঈদুল ফিতর।
মূলত ঈদ শব্দটি আরবী ‘আওদুন’ মূলধাতু হতে এসেছে এর অর্থ: ফিরে আসা, বারবার আসা। আর ফিতর মানে ভঙ্গ করা। যেহেতু ঈদুল ফিতর প্রতি বছর যথা সময়ে আমাদের মাঝে ফিরে আসে এবং যেহেতু এ দিনটিতে আমরা একটি মাসের সুবহি সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও ইন্দ্রিয় সম্ভোগে লিপ্ত না হওয়ার যে বিধান ছিলো তা ভঙ্গ করি। তাই এ দিনটি কে ঈদুল ফিতর বলা হয়েছে।

রাসূল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ দিন সম্পর্কে বলেছেন: এ দিনটিতে তোমরা রোজা রেখো না। এ দিন তোমাদের জন্য আনন্দ-উৎসবের দিন। খাওয়া, পান করা আর পরিবার-পরিজনদের সাথে আনন্দ-উৎসব করার দিন। আল্লাহকে স্মরণ করার দিন। [মুসনাদ আহমাদ, ইবনু হিববান]
একজন সচেতন মুসলিম হিসেবে এ দিনের করণীয় গুলো কী কী? তা জানার বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে।নিম্নে এ প্রসঙ্গে আলোচনা করা হলো।

ঈদুল ফিতরে আমাদের করণীয়ঃ
প্রথমত ধর্মীয়;
১. রোজা না রাখা:
ঈদের দিন রোযা রাখা হারাম। তাই ঈদুল ফিতরের দিনে রোজা রাখা আমাদের জন্য মোটেও ঠিক হবে না। আবু সাঈদ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন: ‘‘রাসূল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম দু’ ঈদের দিন (ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহায়) রোজা রাখতে নিষেধ করেছেন।’’ [সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিম]

২. গোসল করা:
ঈদের সালাতের পূর্বে গোসল করা সুন্নাত। আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রা.) হতে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঈদের নামাযে যাওয়ার পূর্বে গোসল করতেন। [মুয়াত্তা ইমাম মালিক]।

৩. হালকা কিছু খাওয়া:
ঈদের নামাযে যাওয়ার পূর্বে কিছু খাওয়া সুন্নাত। হাদিসে খেজুর বা মিষ্টি জাতীয় কিছু খাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আনাস (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম খেজুর না খেয়ে ঈদগাহে যেতেন না। [সহীহ আল বুখারী]।

৪. সুগন্ধি ব্যবহার করা:
ঈদের দিন আতর বা সুগন্ধি ব্যবহার করা সুন্নাত। ইমাম মালিক (রহ.) বলেন: মুসলিম পন্ডিতগণ প্রত্যেক ঈদে সুগন্ধি ব্যবহার করা ও সুসজ্জিত হওয়াকে মুস্তাহাব বলেছেন। [আল মুগনী]।

৫. সুন্দর পোশাক পরিধান করা:
ঈদের আরেকটি করণীয় হলো এদিনটিতে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন সুন্দর পোষাক পরিধান করা। জাবির (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর একটি সুন্দর জুববা ছিল যা তিনি দুই ঈদে ও জুম‘আর দিনে পরিধান করতেন। [মুসনাদ বায়হাকী]।
অথচ আজকাল আমরা নতুন কাপড় কেনাকে ফরজের চাইতেও বেশি কিছু মনে করি। সারারাত মার্কেটে নারী পুরুষ একসাথে গিজগিজ করে মার্কেট করি। নতুন কাপড় না পেলে যেন ঈদ’ই হচ্ছে না। এ নিয়ে ঝগড়াঝাটি আত্মহত্যা ও ডিভোর্স এর মতো অমানবিক ঘটনা অহরহ ঘটছে। আমাদের সবাইকে এসব অনৈতিক আচরণ যা বাড়াবাড়ির পর্যায়ে চলে যায় তা পরিহার করা উচিত।

৬. সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা:
ইবনু আববাস (রা.) হতে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: আল্লাহ সাদাকাতুল ফিতর প্রদান করাকে বাধ্যতামূলক করেছেন। যা একদিকে অশ্লীল-অনর্থক কথা ও কাজ দ্বারা কলুষিত রোযাকে পবিত্র করে, অন্যদিকে অসহায়-নিঃস্বকে খাদ্য দানে সাহায্য ও সহায়তা করার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
যে ব্যক্তি সাদাকাতুল ফিতর ঈদের নামাযের পূর্বে আদায় করে, তা কবুল করা হবে। আর যে ব্যক্তি ঈদের নামাযের পরে আদায় করবে, তা সাধারণ সাদাকাহ হিসেবে পরিগণিত হবে। [সহীহ ইবনু খুযাইমা]।

৭. পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া :
সাঈদ ইবনু যুবাইর (রা.) হতে বর্ণিত আছে যে, পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া সুন্নাত। রাসুল সাঃ পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যেতেন।
পায়ে হেঁটে যাওয়া সম্ভব না হলে বাহনে চড়ে ঈদগাহে যাওয়া দোষণীয় নয়।

৮. এক রাস্তায় যাওয়া অন্য রাস্তা দিয়ে আসা:
ঈদের আরেকটি সুন্নাত হলো এটি: এক রাস্তা দিয়ে ঈদগাহে যাওয়া এবং অন্য রাস্তা দিয়ে ফিরে আসা। এতে দীর্ঘ হাঁটা এবং বেশি মানুষের সাথে মিশা ও তাদের খুঁজ খবর নেয়ার সুযোগ রয়েছে। ইবনু যুবাইর (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাঃ এক রাস্তা দিয়ে ঈদের সালাতে যেতেন এবং অন্য রাস্তা দিয়ে ফিরে আসতেন। (সহীহ আল বুখারী)

৯. তাকবীর বলাঃ
তাকবীর বলতে বলতে ঈদগাহে যাওয়া সুন্নাত। রমযান সংক্রান্ত আয়াতের শেষের দিকে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, তোমরা (রমযানের) রোজা পূর্ণ করো এবং আল্লাহর বড়ত্ব ও শ্রেষ্টত্ব বর্ণনা করো। [সূরা আল বাকারা: ১৮৫]।
ইবনু উমার (রা.) হতে বিভিন্ন সনদে বর্ণিত আছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘর থেকে বের হয়ে ঈদগাহে পৌঁছার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তাকবীর বলতেন।

তাকবীর কিভাবে বলতে হবে:
আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, ওয়ালিল্লাহিল হামদ। এর সাথে বাড়িয়ে এভাবেও বলা যাবে: আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, ওয়ালিল্লাহিল হামদ। আল্লাহু আকবার কাবীরা, ওয়াল হামদুলিল্লাহি কাছিরা, ওয়া সুবহানাল্লাহি বুকরাতাও ওয়াসিলা। [আত তাবারানী]।

১০. ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় :
ঈদের দিনে পারস্পারিক ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় করা ঈদের আরেকটি সুন্নাত। প্রত্যেক জাতি তাদের স্ব স্ব ভাষায় শুভেচছা বিনিময় করতে পারে। ‘‘তাক্বাববালুল্লাহা মিন্না ওয়া মিনকুম’’ (আল্লাহ আমাকে ও আপনাকে কবুল করুন)। এ জাতীয় যে কোন বাক্য দ্বারা ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় করা।

১১. ঈদের সালাত আদায় করা:
ঈদের দিন ঈদের সালাতের পূর্বে কোন সালাত আদায় করা ঠিক নয়। ইবনু আববাস (রা.) বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঈদের দিন বের হয়ে শুধুমাত্র ঈদের দু’ রাকা‘আত সালাত আদায় করতেন। ঈদের সালাতের পূর্বে বা পরে নফল বা অতিরিক্ত কোন সালাত আদায় করতেন না। [সহীহ আল বুখারী, সহীহ মুসলিম ও সুনান আত তিরমিযী]।
ইবনু উমার, আবু সাঈদ ও ইবনু আববাস (রা.) হতে বর্নিত আছে, মহানবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুতবার আগে ঈদের সালাত আদায় করতেন। [সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিম]।

১২. খুতবাহ শুনা ও দোয়া করা : ঈদের সালাতের পরে ইমাম সাহেব খুতবাহ প্রদান করবেন এবং মুসল্লিগণ তা মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করবেন। এটি পালন করা ওয়াজিব।
খুতবাতে মুসলিম উম্মাহর দিক-নির্দেশনামূলক বাণী ও সকলের কল্যাণের জন্য দোয়া থাকা অবশ্যই বাঞ্ছনীয়। রাসূল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: ‘‘আল্লাহর কাছে সর্বাধিক সম্মানিত বস্তু হল দোয়া।
’’তিনি স্বয়ং মানুষকে দোয়া করতে নির্দেশ দিয়েছেন। যারা দোয়া করে না তাদেরকে তিনি অহংকারী বলে আখ্যায়িত করেছেন।
আল্লাহ ইরশাদ করেন: ‘‘আমার কাছে প্রার্থনা কর, আমি তোমাদের প্রার্থনা কবুল করবো। যারা অহংকারের বশে আমার ইবাদত হতে বিমুখ, তারা অবশ্যই জাহান্নামে প্রবেশ করবে।’’ [সূরা মু’মিম: ৬০]। তাই এ দিনে আমাদের উচিত মাতা-পিতা, আত্মীয় স্বজন, মুসলিম উম্মাহর সার্বিক কল্যাণ ও মৃতদের রূহের মাগফিরাত কামনা করে আল্লাহর কাছে একাগ্রচিত্তে দোয়া চাওয়া।

দ্বিতীয় করণীয়ঃ
এ দিনের সমাজিক করণীয় কাজগুলো হলো পাড়া-প্রতিবেশি, আত্মীয়-স্বজন, গরীব-অসহায় এতিম মিসকিন নির্বিশেষে সকলের সাথে মিশা, সকলের খোঁজ-খবর নেয়া, তাদেরকে বাসা বা বাড়িতে নিমন্ত্রণ জানানো ও সাধ্যমতো খাওয়ানো।
এছাড়া ঈদগাহের কাজে শরীক হওয়া, দলে দলে তাকবীর বলতে বলতে ঈদগাহে যাওয়া, সবার সাথে আনন্দ-খুশি প্রকাশ করা, পারস্পারিক ভাব বিনিময় ও হিংসা ক্লেশসহ সকল উঁচুনিচু ভেদাভেদ ভুলে সবার সাথে একাকার হয়ে যাওয়া।

পরিশেষে বলতে চাই ঈদুল ফিতরের ধর্মীয় করণীয় গুলো পালন করার মাধ্যমে নিজেকে ধর্মীয় আনুগত্য ও অনুভূতি সম্পন্ন একজন প্রকৃত মুসলিম হিসেবে গড়ে তোলা। এবং সমাজিক করণীয় গুলো পালনের মাধ্যমে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে শান্তি, শৃঙ্খলা, ভ্রাতৃত্ব, সাম্য, সম্প্রীতি, সংহতি সহমর্মিতা ও ন্যায়বিচারের নজির স্থাপন করা আমাদের একান্ত করণীয়।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

আরও দেখুন...

Close
Close