ফিচার

বোরকা

জুঁই ইসলাম : বোরকা ইসলামী পোশাক। সেই প্রাচীনকাল থেকে নারীরা পর্দা করার জন্য বোরকাকে বেছে নিয়েছেন। শুধু যে আমাদের দেশে বোরকার প্রচলন তা নয়, মধ্যপ্রাচ্যসহ সকল মুসলিম দেশের নারীরা পর্দা করার জন্য বোরকাকে অগ্রাধিকার দিয়ে আসছেন। আমরা যখন স্কুল কলেজে পড়তাম তখন সাধারণ সেলোয়ার কামিজ-ই পরেছি। বোরকা স্কুল বা কলেজে ততোটা ছিলো না, কেউ পরতো না তা বলছি না তবে বোরকা পরা মেয়ের সংখ্যা কম ছিলো। আমরা যতো আধুনিক হচ্ছি বোরকা ততোবেশি আকর্ষণীয় পোশাকে পরিণত হচ্ছে। আমি যখন মার্কেট কিংবা বাইরে কোথাও বেড়াতে যাই বেশির ভাগই চোখে পড়ে বোরকা পরা মেয়ে। শুধু কি বোরকা? সাথে নেকাবও পরা থাকে। ভালো কথা ইসলামিক পোশাক। আমাদের অভিভাবকরা ঘরের মেয়ে একটু বড় হলেই তাকে বোরকা পরা বাধ্যতামূলক করে দেন। আবার সব মেয়েদের যে বাধ্য করা হয় তা না কেউ কেউ একেবারে ছোটকাল থেকেই বোরকা পরে, কেউ শখ করে হঠাৎ হঠাৎ পরে, কেউ আবার বিশেষ প্রয়োজনে পরে। তবে পর্দা মানে যে শুধু বোরকা তা তো না। ঢিলেঢালা সেলোয়ার কামিজও ইসলাম সমর্থন করে।
যে কারণেই বোরকা পরুক- ইসলামী পোশাক হিসাবে এখন বোরকার ভিন্নতা এসেছে, তেমনি চাহিদাও। আগেরকার সময়ে আমাদের মা, দাদিরা বা তারও আগে যেসব বোরকা ছিল সবই ছিল সাদা-মাটা ও ঢিলেঢালা আর তাদের একটাই উদ্দেশ্য ছিল শরীরকে ঢেকে রাখা। বর্তমান বোরকার মতো তাদের বোরকায় এতোটা ফ্যাশন বা চাকচিক্য ছিল না। কিছু কিছু বোরকা মেয়েদের সাধারণ পোশাকের চাইতেইও বেশি আকর্ষণীয়। এতো বেশি কারুকাজ থাকে বিধায় বিয়েতেও বোরকার প্রতিযোগিতা হয় কার বোরকা কতো সুন্দর? কতো দাম ইত্যাদি। মাঝে মাঝে আমি অবাক হই বোরকার দাম শুনে, পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা দামের বোরকাও এখন অনলাইনে কিংবা শপিংমল থেকে কিনছেন আমার আপুরা। আচ্ছা ইসলাম কি এতো চাকচিক্য কিংবা বিলাসিতা পছন্দ করে?
তবে বাংলাদেশের এই স্বাভাবিক চিত্রের উল্টোপিঠও আজকাল দেখা যাচ্ছে। এ যুগের বোরকা পরা মেয়েদের পেছনেও ইদানীং বখাটে ছেলেরা ঘুরঘুর করছে। বোরকা হেফাযতের কারণ হওয়ার পরও অনেক বোরকাবৃতা দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। গৃহবধূ থেকে স্কুল-কলেজ এমনকি মাদরাসার ছাত্রীরাও সাম্প্রতিককালে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার সম্মুখীন হচ্ছেন। তারাও আজকাল খবরের শিরোনাম হচ্ছেন।
সম্প্রতি এক ডাক্তারের চেম্বারে দেখলাম বাবা মেয়েকে নিয়ে এসেছেন ডাক্তার দেখাবেন- মেয়ের মাথার চুল পড়ে যাচ্ছে। মেয়েটি বোরকা পরা হিজাবও লাগানো। ডাক্তার বললেন রোগীর মাথা দেখবেন, চুল কতো পরিমাণ পড়ছে কিংবা কেন? মেয়েটি তো হিজাব খুলে না। হিজাব খুলে চুলও দেখায় না। মেয়েটির বাবা তাঁকে প্রায় ধমক দিয়ে বলে উঠলেন, ডাক্তারের কাছে সবকিছু খুলে বলতে হয়, না হয় তিনি তোমার চুল পড়ার ঔষুধ করবেন কি করে? তখন মেয়েটা হিজাব খুললো। মেয়েটির মুখের দিকে আমি তাকালাম। বেশ মায়াবী চেহারা। প্রচন্ড গরমে ওর মুখে ঘাম জমে আছে, বয়স ১৮/২০ এমন হবে। যাই হোক মেয়েটির মাথার চুল ডাক্তার সাব দেখলেন এবং ঔষুধ লিখে দিয়ে নিয়ম কানুনও বলে দিলেন। বুঝানোর সময় ডাক্তার সাব মেয়েটিকে মা মা বলে ডাকছিলেনÑ উনার ব্যবহার দেখে আমারও ভালো লাগলো সাধারণত আমাদের ডাক্তাররা এমন করে কথা বলেন না। আমি মনে করি ডাক্তারের ভালো ব্যবহারের কারণে রোগী অর্ধেক সুস্থ হয়ে যায়, যা আমাদের দেশের খুব কম ডাক্তারদের কাছে মিলে। যাই হোক ডাক্তার প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে বোরকা নিয়ে কথা বলি।
মেয়েটি তার বাবার সাথে চলে গেলো। যাওয়ার সময় আমি ওর পেছন দিকে তাকাতে বেশ একটা হুমড়ি খেলাম-কারণ সে এতো টাইট একটা বোরকা পরেছে যে ওর কোমরটা প্রায় বুঝা যাচ্ছে কতো ইঞ্চি হবে! অবাক হলেন? সেদিন আমিও অবাক হয়েছি। যে মেয়ে ডাক্তারকে মুখ কিংবা চুল দেখাচ্ছিল না সে তার কোমর কতো ইঞ্চি সেটা সবাইকে জানিয়ে দিচ্ছে তার এই বোরকার মাধ্যমে। এটা যে শুধু মেয়ের দোষ তা না-এটা পরিবারেরও দোষ, বড়রা যদি এসব ব্যাপার না দেখেন ছোটরা কি করে বুঝবে? শুধু ঐ মেয়েটি কেনো আমাদের সমাজে বর্তমানে শতকরা ৮০ জনেরও বোরকা ইসলামি বিধির মধ্যে পড়ে না। বোরকা সবাই পরছে ঠিকই কিন্তু বিভিন্ন ফ্যাশনের চাকচিক্য আর বডি ফিটনেস। এতে করে তার শারীরিক সৌন্দর্য আরও বেশি প্রদর্শিত হচ্ছে লোক সমাজে। একটা মেয়ে পোশাক পরবে তার শারীরিক সৌন্দর্য ঢেকে রাখার জন্য। কিন্তু বর্তমানে তা হচ্ছে উল্টো। আমরা মেয়েরা যতো বেশি ঢাকনা দিচ্ছি ততো বেশি আকর্ষণীয় হচ্ছি এসব ফ্যাশনের বোরকা পরে দিন দিন।
দিন দিন বোরকার চাহিদা বাড়ছে ঠিকই তেমনি বাড়ছে যৌন হয়রানী বা বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ডও। দেখা যায় বোরকা পরে খুব সহজে নিজেকে ঢেকে নিয়ে অপরাধে জড়াচ্ছে আমাদের বোনেরা। খুব সহজে বাইকে উঠে প্রেমিকের সাথে অবাধে চলাফেরা কিংবা হোটেল রেস্তোরাঁয় নির্ধিদ্বায় আড্ডা কিংবা অসমাজিক কাজে লিপ্ত হচ্ছে তারা।
যৌন হয়রানি বা ইভটিজিং নিয়ে প্রতিদিনই কোনো না কোনো কাহিনী আমাদের দেশে ঘটে থাকে যা আমরা খবরে কিংবা নিউজ পেপারে দেখতে পাই। বাবা-মা কষ্ট করে মেয়েকে শহরে লেখাপড়া করতে পাঠান। কিন্তু সেই মেয়েও দেখা যায় বোরকা পরে রাতের আঁধারে কিংবা দিনের আলোয় বোরকা আর হিজাব পরে অপরাধ করে যাচ্ছে।
বোরকা পরে কারো বাসায় চুরির ঘটনা প্রায় শোনা যায়। ক’দিন আগেও আমাদের এলাকায় এক মহিলা বোরকা পরে বাসায় ঢোকে মোবাইল ফোন নিয়ে পালাবার সময় ধরা পরে। তাকে অনেক মারামারি করে এলাকার ছেলেগুলো। ব্যক্তিগতভাবে এ বিষয়ে বেশ আহত হয়েছি, কারণ ঘটনা সত্য কিছু বলার নেই। ঈদের সময় মার্কেটে বোরকা পরে নানা ব্যাগ চুরির ঘটনা ঘটে। একটা দোকানে অনেক জন বোরকা পরা নারী থাকতে পারেন এটাই স্বাভাবিক, কিন্তু কার ভিতরে কি উদ্দেশ্য আমরা কি তা জানি? হঠাৎ শোনা যায় কোন মহিলা বলে উঠছেন আমার পার্স কই? কেউ তো প্রস্তুত থাকেন না কখন কার ব্যাগ চুরে কাটবে?
কাউকে দেখা যায় বোরকা পরেছেন তো তার মুখ খোলা। উপরন্তু মুখম-লে মেকাপ আর রংয়ের ছড়াছড়ি। ঠোঁটে কড়া লিপস্টিকের দৃষ্টিকটু কারুকাজ। আরেক শ্রেণির নারীদের দেখা যায় জিন্স প্যান্ট আর টাইট গেঞ্জি পরেন, কিন্তু মাথা আবৃত রাখেন ফ্যাশনেবল স্কার্ফ দিয়ে। শরীরের গঠন তাতে কেবল সুদৃশ্যমানই হয়ে ওঠে না, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা পুরুষকে আর দশজন বেপর্দা নারীর চেয়ে বরং বেশিই আকর্ষণ করে। আরেকটি শ্রেণি আছে যারা বোরকা পরেন; মুখও ঢাকেন ঠিক, কিন্তু সে বোরকা আর স্কার্ফ এতোটাই পাতলা যে তাতে আবৃত দেহের আকার-আকৃতি অক্লেশেই পুরুষের লোলুপ দৃষ্টিতে টেনে নেয়।
সেদিন এক বোন বললো, যৌন হয়রানি বিষয়টি তার কাছে ফালতু মনে হয়। এটিকে এদেশে অনর্থক বড় করে দেখা হচ্ছে বলে তার মন্তব্য। তার মতে, মেয়েরা দেখিয়ে বেড়াবে, আর তাতে কেউ কিছু বললে পুরুষের দোষ? নারীর বুঝি দোষ নেই? সব দোষ পুরুষের? তার মন্তব্য আমার অনুভূতিকে আহত করে। আসলে যৌন হয়রানির ফলে যেখানে অহরহ আত্মহত্যার মতো ঘটনা ঘটছে সেখানে একে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। একথা ঠিক যে মেয়েরা উস্কানিমূলক পোশাক পরছে এবং যৌন হয়রানি-এর এটিও একটি কারণ। তবু কথা থেকে যায়। সংখ্যায় অল্প হলেও স্কুল-কলেজের মেয়েরাও এটা থেকে রেহাই পাচ্ছেন না। যুব সমাজের অবক্ষয়ে এটিও একটি কারণ ।
আমরা রোজ সমাজের অশান্তি ও অপরাধগুলো নিয়ে সমালোচনা করি, চিন্তা করি। নিজেদের সন্তান কোনো দুর্ঘটনার শিকার হোক, অপক্ক বয়সে না বুঝে কোনো খারাপ ছেলের খপ্পরে পড়ুক, বখাটের হাতে ধর্ষিতা বা লাঞ্ছিতা হোক কেউ তা চাই না। কিন্তু মেয়েদের পোশাক, উচ্ছৃংখল আচরণ আর অতি আড়ম্বরপূর্ণ পদচারণ যে এসব ডেকে আনে গুরুত্ব দিয়ে তা ভাবি না। সাহস করে সে সত্য উচ্চারণ করি না। তাই বদলায় না আমাদের ভাগ্যও। থামে না নির্যাতিতার কান্না। বারবার পুনরাবৃত্তি ঘটে ধর্ষণ আর নির্যাতনের। যার জেরে ঘটে অসহায় মেয়েদের আত্মহত্যা আর আত্মাহুতির ঘটনা।
হ্যা, যারা বোরকা পরা সেসব নারীর সমালোচনা না করে বোরকাকে সমালোচনায় বিদ্ধ করেন, তাদেরও একটি বিষয় বিবেচনায় রাখা উচিত, কিছু দুষ্ট প্রকৃতির নারী তাদের অপকর্ম নির্বিঘেœ সম্পাদনের জন্য বোরকা ব্যবহার করেন। আবাসিক বোর্ডিং এ অসামাজিক কাজে কিংবা ছিনতাই বা চুরি-ডাকাতির ক্ষেত্রেও এর আশ্রয় নেয় অনেক দুষ্ট লোক। হতভাগা কিছু নারী পরীক্ষায় নকলের জন্যও বোরকাকে কলংকিত করেন। এদের বিচার তো আল্লাহই করবেন। এ জন্য বোরকাকে দোষারোপ করা বা ধর্মদ্রোহীদের ভাষায় বোরকাবৃতাদের দোষ খুঁজে বেড়ানো আর যাই হোক কোনো ঈমানদারির পরিচয় হতে পারে না। এদের অপকর্মকে যদি কেউ বোরকা না পরার যুক্তি হিসেবে তুলে ধরেন তবে তিনি অজ্ঞতা কিংবা ধর্মদ্রোহিতার পরিচয় দেবেন। কিছু লোকের অপকর্মের ভার কখনো কোনো শ্রেণীর ওপর চাপানো সুবিবেচনা হতে পারে না।
আমরা যেমন সমাজ থেকে এই অন্যায় অভিযোগ ও সমালোচনার মূলোৎপাটন চাই, তেমন বোরকা পরা নারীদের কাছেও কামনা করি দায়িত্বশীল আচরণ। বোরকাবৃতারা কিছুতেই নিজের মর্যাদা ও সম্মানের কথা ভুলতে পারেন না। তাদের জানতে হবে কোন কাজটি তাদের সম্মানের সঙ্গে যায় আর কোনটি যায় না। শুধু সামাজিকতা রক্ষায় কিংবা বাবা-মার পীড়াপীড়িতে নয়, সকল নারীকে বোরকা পরতে তথা পর্দা করতে হবে আল্লাহর হুকুম সম্পর্কে জেনে এবং বিধানটিকে বুঝে। বুঝতে হবে বোরকা নয় আল্লাহর নির্দেশ পর্দা রক্ষা করা। আপাদমস্তক নিজেকে ঢেকে ফেলা এবং বেগানা পুরুষের সংশ্রব থেকে যথাসাধ্য দূরত্ব বজায় রাখা। পরিবারের নিরাপদ ছায়াই নারীর ঠিকানা। এর বাইরে যাবেন কেবল প্রয়োজনে। এর অন্যথা হলেই বিপত্তি।
এ জন্য অভিভাবকদেরও দায়িত্ব নিতে হবে। সন্তানকে আর সব শিক্ষার পাশাপাশি ইসলামের মৌলিক শিক্ষাও দিতে হবে। পর্দা এবং ইসলামের শিষ্টাচার শেখাতে হবে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে। পাশাপাশি তাদের জন্য পরিবারে নিশ্চিত করতে হবে ইসলামী অনুশাসন এবং সঠিক গৃহশিক্ষার। নিজের কষ্টে উপার্জিত অর্থ দিয়ে কলিজার টুকরো মেয়েকে বিধর্মী পোশাক কিংবা পুরুষদের বেশ কিনে দেবেন না। সন্তানকে বানাবেন না আল্লাহর রাসূলের অভিশাপের ভাগিদার। দায়িত্বশীল হিসেবে নিজেকেও বানাবেন না অপরাধী। বিচার দিবসে ন্যায়পরায়ণ আল্লাহর দরবারের আসামী।
শেষে একটি কথাই বলতে চাই- আমি বোরকা অবমাননা করে কিছু বলতে চাই না কিংবা কোন বোনকেও না, আমি শুধু বলতে চাই আজকাল বোরকার যে অপব্যবহার হচ্ছে সেই সম্পর্কে। সকল বোনই বোরকা পরতে পারেন, হিজাব করতে পারেন শুধুমাত্র একটু সচেতন হলেই হল। যাতে ইসলামী এ ধর্মীয় পোশাককে কেউ ছোট করে দেখার সুযোগ না পায়।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

আরও দেখুন...

Close
Close