ধর্ম

একজন মুসলিমের নৈতিক চরিত্র

বায়েজীদ মাহমুদ ফয়সল:
নৈতিক চরিত্র মানবজীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ। যারা উন্নত নৈতিক চরিত্রের অধিকারী তারা পরিচিতজনদের আস্থা সহজেই অর্জন করতে পারে। পরিবার আত্মীয়স্বজন সমাজ তাদের দ্বারা উপকৃত হয়। ইসলামে নৈতিক চরিত্রকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো লোক সে বা তারা যাদের চরিত্র তোমাদের সবার চেয়ে উত্তম।’ (বুখারী ও মুসলিম)
ইসলামে ঈমানের পর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে নৈতিক চরিত্রকে। নৈতিক চরিত্রকে কল্যাণের উৎস হিসেবেও ঘোষণা করা হয়েছে। পৃথিবীতে নবী করিম (সা.)-এর আগমন ঘটেছিল মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটানোর জন্য। মানুষকে সব ধরনের ক্লেদ কালিমামুক্ত করে মন মননে পরিচ্ছন্ন মানুষে রূপান্তরের জন্য। নৈতিক চরিত্রের অধিকারীকে এ জন্যই সর্বোত্তম বলে অভিহিত করা হয়েছে নবী করিম (সা.)-এর হাদিসে। মনুষ্য সত্তার বিকাশ ঘটাতে হলে সবকিছুর আগে উন্নত চরিত্রের অধিকারী হতে হবে। উন্নত চরিত্রের অধিকারীরা কিয়ামতের দিনে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী হবেন। আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন ঈমানদার বান্দার দাঁড়িপাল্লায় উত্তম চরিত্র অপেক্ষা বেশি ভারী জিনিস আর কিছুই হবে না। আর যে লোক বেহুদা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট ধরনের কথাবার্তা বলে আল্লাহ তায়া’লা তাকে মোটেই পছন্দ করেন না।’ (তিরমিজি)
উন্নত চরিত্রের অধিকারী হতে হলে প্রথমেই ঈমানদার হতে হবে। ঈমানদার এবং উন্নত চরিত্রের অধিকারী এ দুটির একটি অপরটির পরিপূরক। একমাত্র ঈমানদার মানুষের পক্ষেই উন্নত চরিত্রের অধিকারী হওয়া সম্ভব। যেমনÑ
১. সত্যবাদিতা : আল্লাহ তায়া’লা এবং তার রাসুল (সা.) আমাদের যে-সকল ইসলামী চরিত্রের নির্দেশ দিয়েছেন, তার অন্যতম হচ্ছে সত্যবাদিতার চরিত্র। আল্লাহ তায়া’লা বলেন : ‘হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং তোমরা সত্যবাদীদের সাথী হও।’ (সুরা আত-তাওবাহ : ১১৯)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ইসলামী চরিত্রের মৌলিক বিষয়সমূহ : ‘তোমরা সততা অবলম্বন গ্রহণ কর, কেননা সত্যবাদিতা পুণ্যের পথ দেখায় আর পুণ্য জান্নাতের পথ দেখায়, একজন লোক সর্বদা সত্য বলতে থাকে এবং সত্যবাদিতার প্রতি অনুরাগী হয়, ফলে আল্লাহর নিকট সে সত্যবাদী হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়ে যায়।’ (মুসলিম)
২. আমানতদারিতা : মুসলিমদের সেসব ইসলামী চরিত্র অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তার একটি হচ্ছেÑআমানতসমূহ তার অধিকারীদের নিকট আদায় করে দেওয়া। আল্লাহ তায়া’লা বলেন : ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন আমানতসমূহ তার হকদারদের নিকট আদায় করে দিতে।’ (সুরা আন-নিসা : ৫৮)
রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর সম্প্রদায়ের নিকট আল-আমিন উপাধি লাভ করেছিলেন, তারা তাঁর নিকট তাদের সম্পদ আমানত রাখত। রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং তার অনুসারীদের মুশরিকরা কঠোরভাবে নির্যাতন শুরু করার পর যখন আল্লাহ তাকে মক্কা থেকে মদিনা হিজরত করার অনুমতি দিলেন তিনি আমানতের মালসমূহ তার অধিকারীদের নিকট ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা না করে হিজরত করেননি। অথচ যারা আমানত রেখেছিল তারা সকলেই ছিল কাফের। কিন্তু ইসলাম তো আমানত তার অধিকারীদের নিকট ফিরিয়ে দিতে নির্দেশ দিয়েছে যদিও তার অধিকারীরা কাফের হয়।
৩. অঙ্গীকার পূর্ণ করা : মুসলিমের মহান চরিত্রের অন্যতম হচ্ছে অঙ্গীকার পূর্ণ করা। আল্লাহ তায়া’লা বলেন: ‘আর অঙ্গীকার পূর্ণ কর, কেননা অঙ্গীকার সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হবে।’ (সুরা আল-ইসরা : ৩৪)
আর রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা মুনাফিকের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে গণ্য করেছেন।
৪. বিনয় : মুসলিম চরিত্রের আরেকটি হচ্ছেÑএকজন মুসলমান তার অপর মুসলিম ভাইদের সঙ্গে বিনয়ী আচরণ করবে। সে ধনী হোক বা গরিব। আল্লাহ তায়া’লা বলেন : ‘তুমি তোমার পার্শ্বদেশ মুমিনদের জন্য অবনত করে দাও।’ (সুরা আল-হিজর : ৮৮)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : ‘আল্লাহ তায়া’লা আমার নিকট ওহি করেছেন যে, তোমরা বিনয়ী হও যাতে একজন অপরজনের উপর অহংকার না করে। একজন অপরজনের উপর সীমালঙ্ঘন না করে।’ (মুসলিম)
৫. মাতাপিতার প্রতি সদ্ব্যবহার : মাতাপিতার প্রতি সদ্ব্যবহার উত্তম চরিত্রের অন্যতম। আর এটা তাদের অধিকার মহান হওয়ার কারণে, যে অধিকার স্থান হলো আল্লাহর হকের পরে। আল্লাহ তায়া’লা বলেন : ‘আর আল্লাহর ইবাদত কর, তাঁর সঙ্গে কোনো কিছুকে শরীক করো না এবং মাতাপিতার প্রতি সদ্ব্যবহার কর।’ (সুরা আন-নিসা : ৩৫)
আল্লাহ তায়া’লা তাদের আনুগত্য, তাদের প্রতি দয়া ও বিনয় এবং তাদের জন্য দুআ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তায়া’লা বলেন : ‘তাদের উভয়ের জন্য দয়ার সঙ্গে বিনয়ের ডানা নত করে দাও এবং বল, হে আমার রব! তাদের প্রতি দয়া কর যেভাবে শৈশবে আমাকে তারা লালন-পালন করেছেন।’ (সুরা আল- ইসরা : ২৪)
এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট এসে জিজ্ঞেস করল : ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমার উত্তম আচরণ পাওয়ার সবচেয়ে বেশি অধিকারী ব্যক্তি কে? তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’ অতঃপর জিজ্ঞেস করল তারপর কে? তিনি উত্তর দিলেন, ‘তোমার মা।’ অতঃপর জিজ্ঞেস করল তার পর কে? তিনি উত্তর দিলেন, ‘তোমার মা।’ অতঃপর জিজ্ঞেস করল তার পর কে? উত্তর দিলেন, ‘তোমার পিতা।’ (বুখারী ও মুসলিম)
মাতাপিতার প্রতি এ সদ্ব্যবহার ও দয়া অনুগ্রহ অতিরিক্ত বা পূর্ণতা দানকারী বিষয় নয় বরং তা হচ্ছে সকল মানুষের ঐক্যমতের ভিত্তিতে ফরজে আইন।
৬. আত্মীয়তার সর্ম্পক বজায় রাখা : আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা ইসলামী চরিত্রের অন্যতম। আর তারা হচ্ছে নিকটাত্মীযগণ যেমনÑদাদা, দাদি, নানা, নানি, চাচা, চাচি, মামা, ফুফা, খালা, ভাই, বোন প্রমুখ। আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা ওয়াজিব, আর তা ছিন্ন করা জান্নাত থেকে বঞ্চিত ও অভিশাপের কারণ। আল্লাহ তায়া’লা বলেন : ‘যদি তোমরা ক্ষমতা পাও, তাহলে কি তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করবে? তারা তো ওইসব লোক যাদের প্রতি আল্লাহ অভিশাপ করেছেন। এতে তিনি তাদেরকে বধির করে দিয়েছেন এবং তাদের দৃষ্টি অন্ধ করে দিয়েছেন।’ (সুরা মুহাম্মাদ : ২২-২৩)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারী বেহেশতে প্রবেশ করবে না।’ (বুখারী ও মুসলিম)
৭. প্রতিবেশীর প্রতি সুন্দরতম ব্যবহার : প্রতিবেশীর প্রতি সুন্দরতম ব্যবহার হচ্ছে ইসলামী চরিত্রের অন্যতম। প্রতিবেশী হচ্ছে সে সব লোক যারা আপনার বাড়ির আশেপাশে বসবাস করে। যে আপনার সবচেয়ে নিকটবর্তী সে সুন্দর ব্যবহার ও অনুগ্রহের সবচেয়ে বেশি হকদার। আল্লাহ তায়া’লা বলেন : ‘আর মাতাপিতার প্রতি সদ্ব্যবহার কর, নিকটাত্মীয়, এতিম, মিসকিন নিকটতম প্রতিবেশী ও দূরবর্তী প্রতিবেশীর প্রতিও।’ (সুরা আন-নিসা : ৩৬)
এতে আল্লাহ নিকটতম ও দূরবর্তী প্রতিবেশীর প্রতি সদ্ব্যবহার করতে ওসিয়ত করেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : ‘জিবরাঈল (আ.) আমাকে প্রতিবেশীর ব্যাপারে ওসিয়ত করতেছিলেন এমনকি আমি ধারণা করে নিলাম যে, প্রতিবেশীকে উত্তরাধিকার বানিয়ে দেওয়া হবে।’ (বুখারী ও মুসলিম)
অর্থাৎ আমি মনে করেছিলাম যে, ওয়ারিশদের সঙ্গে প্রতিবেশীর জন্য মিরাসের একটি অংশ নির্ধারিত করে দেবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) আবুজর (রা.)-কে লক্ষ্য করে বলেন, ‘হে আবুজর! যখন তুমি তরকারি রান্না কর তখন পানি বেশি করে দাও, আর তোমার প্রতিবেশীদের অঙ্গীকার পূরণ কর।’ (মুসলিম)
প্রতিবেশীর পার্শ্বাবস্থানের হক রয়েছে যদিও সে আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলের প্রতি অবিশ্বাসী বা কাফের হয়।
৮. মেহমানের আতিথেয়তা : মুসলিম চরিত্রের আরেকটি হচ্ছে মেহমানের আতিথেয়তা। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী : ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং পরকালের প্রতি বিশ্বাস করে সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে।’ (বুখারী ও মুসলিম)
৯. সাধারণভাবে দান ও বদান্যতা : মুসলিম চরিত্রের অন্যতম দিক হচ্ছে দান ও বদান্যতা। আল্লাহ তায়া’লা ইনসাফ, বদান্যতা ও দানকারীদের প্রশংসা করেছেন। আল্লাহ তায়া’লা বলেন : ‘যারা আল্লাহর রাস্তায় নিজেদের সম্পদ ব্যয় করে অতঃপর যা খরচ করেছে তা থেকে কারো প্রতি অনুগ্রহ ও কষ্ট দেওয়ার উদ্দেশ্য করে না, তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের নিকট প্রতিদান রয়েছে। তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুশ্চিন্তাও করবে না।’ (সুরা আল-বাকারা : ২৬২)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : ‘যার নিকট অতিরিক্ত বাহন থাকে সে যেন যার বাহন নেই তাকে তা ব্যবহার করতে দেয়। যার নিকট অতিরিক্ত পাথেয় বা রসদ রয়েছে সে যেন যার রসদ নেই তাকে তা দিয়ে সাহায্য করে।’ (মুসলিম)
১০. ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা : ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা হচ্ছে ইসলামী চরিত্রের অন্যতম বিষয়। অনুরূপভাবে মানুষদের ক্ষমা করা, দুর্ব্যবহারকারীকে ছেড়ে দেওয়া ওজর পেশকারীর ওজর গ্রহণ করা বা মেনে নেওয়াও অন্যতম। আল্লাহ তায়া’লা বলেন : ‘আর যে ধৈর্যধারণ করল এবং ক্ষমা করল, নিশ্চয়ই এটা কাজের দৃঢ়তার অন্তর্ভুক্ত।’ (সুরা আশ-শুরা : ৪৩)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : ‘তারা যেন ক্ষমা করে দেয় এবং উদারতা দেখায়, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দেওয়া কি তোমরা পছন্দ কর না?’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘দান খয়রাতে সম্পদ কমে যায় না। আল্লাহ তায়া’লা ক্ষমার দ্বারা বান্দার মার্যাদাই বৃদ্ধি করে দেন। যে আল্লাহর জন্য বিনয় প্রকাশ করে আল্লাহ তার সম্মানই বৃদ্ধি করে দেন।’ (মুসলিম)
তিনি আরো বলেন, ‘দয়া কর, তোমাদের প্রতি দয়া করা হবে। ক্ষমা করে দাও তোমাদেরও ক্ষমা করে দেওয়া হবে।’ (আহমাদ)
১১. মানুষের মাঝে সমঝোতা ও সংশোধন : মুসলিম চরিত্রের আরেকটি হচ্ছে মানুষের মাঝে সমঝোতা ও সংশোধন করে দেওয়া, এটা একটি মহান চরিত্র যা ভালোবাসা সৌহার্দ প্রসার ও মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতার প্রাণের দিকে নিয়ে যায়। আল্লাহ তায়া’লা বলেন : ‘তাদের অধিকাংশ সলাপরামর্শের মধ্যে কল্যাণ নেই। কেবলমাত্র সে ব্যক্তি ব্যতীত যে সদকাহ, সৎকর্ম ও মানুষের মাঝে সংশোধনের ব্যাপারে নির্দেশ দেয়। যে আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে এসব করে অচিরেই আমরা তাকে মহা প্রতিদান প্রদান করব।’ (সুরা আন- নিসা : ১১৪)
১২. লজ্জা : মুসলিম চরিত্রের অন্যতম আরেকটি চরিত্র হচ্ছে লজ্জা। এটা এমন একটি চরিত্র যা পরিপূর্ণতা ও মর্যাদাপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের দিকে আহবান করে। অশ্লীলতা ও বেহায়াপনা থেকে বারণ করে। লজ্জা আল্লাহ তায়া’লার পক্ষ থেকে হয়ে থাকে। ফলে মুসলমান লজ্জা করে যে, আল্লাহ তাকে পাপাচারে লিপ্ত দেখবে। অনুরূপভাবে মানুষের থেকে এবং নিজের থেকেও সে লজ্জা করে। লজ্জা অন্তরে ঈমান থাকার প্রমাণ বহন করে। নবী করিম (সা.) বলেছেন : ‘লজ্জা ঈমানের বিশেষ অংশ।’ (বুখারী ও মুসলিম)
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেন, ‘লজ্জা কল্যাণ ছাড়া আর কিছুই নিয়ে আসে না।’ (বুখারী ও মুসলিম)
১৩. দয়া ও করুণা : মুসলিম চরিত্রের আরেকটি উল্লেখযোগ্য চরিত্র হচ্ছে দয়া বা করুণা। এ চরিত্রটি অনেক মানুষের অন্তর থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। ফলে তাদের অন্তর পাথরের মত অথবা এর চেয়েও শক্ত হয়ে গেছে। আর প্রকৃত মুমিন হচ্ছে দয়াময়, পরোপকারী, গভীর অনুভূতি সম্পন্ন উজ্জ্বল অনুগ্রহের অধিকারী। আল্লাহ তায়া’লা বলেন : ‘অতঃপর সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হয় যারা ঈমান এনেছে পরস্পর পরস্পরকে ধৈর্য ও করুণার উপদেশ দিয়েছে। তারা হচ্ছে দক্ষিণ পন্থার অনুসারী।’ (সুরা আল-বালাদ : ১৭- ১৮)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : ‘মুমিনদের পারস্পরিক সৌহার্দ, করুণা, অনুকম্পার উপমা হচ্ছে একটি শরীরের মত। যখন তার একটি অঙ্গ অসুস্থ হয় গোটা শরীর নিদ্রাহীনতা ও জ্বরে আক্রান্ত হয়।’ (মুসলিম)
১৪. ইনসাফ বা ন্যায়পরায়ণতা : ন্যায়পরায়ণতা মুসলিম চরিত্রের আরেকটি অংশ। এ চরিত্র আত্মার প্রশান্তি সৃষ্টি করে। সমাজে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা এবং বিভিন্ন প্রকার অপরাধ বিমোচনের দিকে নিয়ে যায়। আল্লাহ তায়া’লা বলেন : ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, ইহসান ও নিকটাত্মীয়দের দান করতে নির্দেশ দেন।’ (সুরা আল- নাহল : ৯০)
আল্লাহ তায়া’লা বলেন : ‘ইনসাফ কর, এটা তাকওয়ার অতীব নিকটবর্তী।’ (সুরা আল মায়িদাহ : ৮)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : ‘ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিরা আল্লাহর নিকট নূরের মিম্বরের উপর বসবে। তারা হল সেসব লোক, যারা বিচার ফায়সালার ক্ষেত্রে, পরিবার-পরিজনের ক্ষেত্রে এবং যে দায়িত্বই পেয়েছে তাতে ইনসাফ করে।’
১৫. চারিত্রিক পবিত্রতা : মুসলিম চরিত্রের আরেকটি বিষয় হচ্ছে চারিত্রিক পবিত্রতা। এ চরিত্র মানুষের সম্মান সংরক্ষণ এবং বংশে সংমিশ্রণ না হওয়ার দিকে পৌঁছে দেওয়া। আল্লাহ তায়া’লা বলেন : ‘যাদের বিবাহের সামর্থ নেই, তারা যেন চারিত্রিক পবিত্রতা গ্রহণ করে। যতক্ষণ না আল্লাহ তার অনুগ্রহে তাকে সম্পদশালী করেন।’ (সুরা আন-নূর : ৩৩)
রাসুল (সা.) বলেছেন : ‘তোমরা আমার জন্য ছয়টি বিষয়ের জিম্মাদার হও। তাহলে আমি তোমাদের জন্য জান্নাতের জিম্মাদার হব। যখন তোমাদের কেউ কথা বলে সে যেন মিথ্যা না বলে। যখন তার কাছে আমানত রাখা হয় তখন যেন খেয়ানত না করে। যখন প্রতিশ্রুতি দেয় তা যেন ভঙ্গ না করে। তোমরা তোমাদের দৃষ্টি অবনত কর। তোমাদের হস্তদ্বয় সংযত কর। তোমাদের লজ্জাস্থান হেজাফত কর।’ (হাদীসটি তাবারানী বর্ণনা করেছেন এবং হাদীসটিকে ‘হাসান’ বলেছেন)
মুসলিমের এসব চরিত্রে এমন কিছু নেই যা ঘৃণা করা যায়। বরং এসব এমন সম্মান যোগ্য মহৎ চারিত্রাবলী যা প্রত্যেক নিষ্কলুষ স্বভাবের অধিকারীর সমর্থন লাভ করে। মুসলিমগণ যদি এ মহৎ চরিত্র ধারণ করতো তাহলে সর্বস্থান থেকে তাদের নিকট মানুষ আগমন করত এবং দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে তারা প্রবেশ করত যেভাবে প্রথম যুগের মুসলমানদের লেনদেন ও চরিত্রের কারণে সে সময়ের মানুষ ইসলামে প্রবেশ করেছিল। একজন ঈমানদার নিজেকে যদি শুদ্ধ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে প্রত্যয়ী হয় তাহলে তার মধ্যে এই গুণাবলি ধারণ করা প্রয়োজন। যা তাকে সব অন্যায় অসত্য এবং অকল্যাণ থেকে দূরে থাকতে অনুপ্রেরণা জোগায়। আল্লাহ তায়া’লা আমাদের সবাইকে উন্নত চরিত্রের অধিকারী হওয়ার তাওফিক দান করুন।
লেখক : প্রাবন্ধিক, প্রকাশক ও সংগঠক

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close