ফিচার

হুমায়ুন আহমেদ মানবিক নন

মোহাম্মদ আব্দুল হক

আমাদের দেশে বইয়ের পাঠক কম। তবে পাঠক যারা আছে তাদের অনেকে প্রচন্ড আগ্রহ থাকা সত্তেও বই কিনে পড়তে পারেনা বইয়ের অধিক মূল্যের কারণে। যদিও আমরা বলে থাকি আমাদের দেশে ‘স’-পিস কিনে ঘর ভরে ফেলে হাজার হাজার টাকায়; কিন্তু বইয়ের বেলায় অনিহা। তারপরও আমি বলবো এখনো আমাদের যে অল্প বইয়ের পাঠক আছেন তাদেরকে আরেকটু সুযোগ দেয়া যেতে পারে। এ কাজটি সর্বাগ্রে একজন প্রকাশকের দ্বারা সম্ভব এবং সেই সাথে প্রতিষ্ঠিত ও বিকশিত লেখকগণ এ ক্ষেত্রে ভালো ভূমিকা রাখতে পারেন। এখন দেশে অধিকাংশ লেখক নিজের টাকা দিয়ে প্রকাশনী থেকে বই বের করে আনেন। এসব লেখকগণ অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের আসল টাকাটাও বই বিক্রী করে উঠাতে পারেন না। কিন্তু বিখ্যাত কবি-সাহিত্যিকদের ক্ষেত্রে লেখা প্রকাশ করে সেভাবে ক্ষতির ঝুঁকিতে পরতে হয়না। বরং তারা আর্থিক ভাবে লাভবান হওয়ার পাশাপাশি নানান সম্মানেও ভূষিত হয়ে থাকেন। সেসব লেখকগণের সুযোগ আছে মূল্য কমিয়ে পাঠককে সুবিধা দেয়ার এবং এতে করে নতুন পাঠকও বাড়বে।

আমরা জানি প্রতিষ্ঠিত লেখকগণকে প্রকাশনীর মালিক টাকা দিয়েই তাঁদের পান্ডুলিপি বই আকারে প্রকাশ করার জন্য নিয়ে যান। যেসব লেখকদের দ্বারে প্রকাশক টাকা নিয়ে হাজির হয়ে থাকেন লেখা সংগ্রহ করার জন্যে, সেসব লেখকরা যদি একটু উদার হন, তবে বাজারে প্রকাশিত তাঁদের বই আরো কম মূল্যে এই গরীব দেশের পাঠক কিনে পড়তে পারবে। আর একজন সুলেখক তো মানবিক বহুগুণ ধারণ করেই মানবতার জয়গান করেন। নিশ্চয়ই পুঁজিবাদের নিষ্পেষণে জর্জরিত সমাজ নিঙরানো একজন লেখক অবহেলিত ও সুবিধা বঞ্চিত অসহায় মানুষের মাঝ থেকে উঠে এসে নিজেই পুঁজির পাহাড় গড়ে তোলে ব্যক্তি স্বার্থকেই প্রাধান্য দিয়ে জীবনে একা প্রতিষ্ঠিত হবেন, এমনটি কোনো সমাজ একজন মানবদরদি লেখকের কাছে প্রত্যাশা করেনা। আমার এই লেখার পরের অনুচ্ছেদ পড়ে কোনো একজন লেখকের অন্ধভক্ত হয়তো আমার উপর বিদ্রূপ করে কথার অস্ত্র ছুঁড়ে দিতে উদ্যত হতে পারেন।

গরীব দেশের একজন লেখক কোটি কোটি টাকা, বিলাসী বাড়ি ও শত শত একর ভূ-সম্পত্তির মালিক। সেই হুমায়ুন আহমেদকে মানবিক লেখক বলছেন! আমি বুঝিনা যে দেশে অশিক্ষা, অখাদ্য ও রাজনীতিকদের কুটচাল ও ভুলচালে সাধারণ মানুষ নিষ্পেষিত, সেখানে তাঁর মতো মানুষ কেমন করে সেন্টমার্টিনে বিলাসী বাড়ি, গাজিপুরে ব্যক্তিগত বিশাল পল্লী এবং আরো কতোকিছু গড়ে ফেলে রেখে গেছেন শুধুই তাঁর আপন পরিবারের জন্যে, যা অন্য দশজন ধনলোভী মানুষ করে থাকেন। তারপরও কি বলবেন তিনি একজন কোমল হৃদয় মানবিক লেখক! আমি বলতে পারছিনা। বর; তিনি পুঁজিবাদী ধারণা পুষতেন মনের গহীনে। তিনি তাঁর জ্ঞান দ্বারা এদেশের দূরবস্থাকে ঘিরে কোটি মানুষের আবেগকে পুঁজি করে পুঁজিপতি হয়েছেন। তিনি ত্যাগী হতে পারেননি। তাঁকে জ্ঞান পাপী বলা যায়। তিনি শোষক শ্রেণির পক্ষের একজন। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম পৃথিবীর সকল বাংলায় জনপ্রিয় হয়েছিলেন এবং আজও তা-ই আছেন। কিন্তু মানুষের তরে তাঁর ত্যাগ আজীবন দেখি। ত্যাগই তাঁকে মানবিক গুণের শীর্ষে উঠিয়ে রেখেছে। জমিদার পুত্র রবীন্দ্রনাথ সকল বাংলায় হিমালয় চূড়া সমান সম্মান অর্জন করেছেন। কিন্তু তাঁর দ্বারা জমিদারি আরো আরো বাড়েনি। ত্যাগই তাঁকে মহান করেছে। হ্যাঁ, একজন লেখক হবেন মানবিক। একজন লেখক যে মাটিতে বিচরণ করবেন, সেই মাটির সন্তানদের তরে লেখালেখির পাশাপাশি ব্যক্তি জীবনেও সেই মাটির মানুষদের, বঞ্চিতদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জীবনের জয়গান করবেন। তবেই তিনি মানবীয় উত্তম গুণের বিখ্যাত লেখকদের সারিতে পৌঁছুতে পারেন।

বলছি লেখক হুমায়ুন আহমেদের কথা। তাঁর গল্প সমূহ শুধু বাংলাদেশে নয় ; বরং সমস্ত বাঙালি পাঠকের মন কেড়েছে। তিনি একজন জনপ্রিয় হয়েছেন। পক্ষান্তরে তিনি শব্দে শব্দে উপন্যাসের কারখানা গড়ে হয়েছেন পুঁজিপতি। কোটি টাকার ব্যয়বহুল চিকিৎসা সুবিধা নিয়ে তাঁর মৃত্যুর পরে জনসমক্ষে তাঁর সম্পদের খুব সামান্যই প্রকাশ হয়েছে, যা অনেক শিল্প-কারখানার মালিকেরও হয়না। দেশের ও সমাজের শোষিত মানুষের লক্কর ঝক্কর ঘরের পাশে একজন লেখক কেমন করে সম্পদের পাহাড় গড়তে পারেন! এরপরও কি বলবেন হুমায়ুন আহমেদ মানবিক লেখক। এরপরও কি আমরা হুমায়ুন আহমেদকে খুঁজবো! এখানে হুমায়ুন আহমেদ একটি নাম হিসেবে উদাহরণ হিসেবে এনেছি। শুধু হুমায়ুন আহমেদ নয়, এখন বাংলাদেশে অত্যন্ত জনপ্রিয় আরো অনেক লেখক আছেন, যারা প্রকৃত মানবদরদি ভূমিকা নিয়ে এদেশের মানুষের কল্যাণে এগিয়ে আসতে পারেন তাঁদের আয়ের অর্থকে ধনতান্ত্রিক চেতনায় শুধু নিজের ও পরিবারের সুখের জন্যে বৃদ্ধি করার চিন্তা না করে। যদি প্রশ্ন করেন এসব কেন বলছি? তাহলে আমি তাঁর জবাব দিতে প্রস্তুত আছি। লেখকগণ সমাজ থেকেই উঠে আসেন। লেখকদের সমাজে অনেক দায় আছে।।
# লেখক _ কলামিস্ট, কবি ও প্রাবন্ধিক

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close