সোনার বাংলাদেশ

স্বামীহারা জীবনযুদ্ধে শিউলি

বয়োজ্যেষ্ঠ, বিধবা ও দুস্থ ব্যক্তিদের সরকার আর্থিক সহায়তা করছেন। যার জমি আছে ঘর নেই, তাদের ঘরও করে দিচ্ছে সরকার। অসহায়দের দশ টাকার এবং ভিজিএফের চালও দিয়েছেন। কিন্তু এর একটিও জোটেনি লক্ষ্মীপুরের শিউলি আক্তারের (৩৪) ভাগ্যে। স্বামীহারা এই নারী ছেলে-মেয়ে আর শাশুড়ীকে বাঁচাতে একাই জীবনযুদ্ধে নেমেছেন।

বৃদ্ধা শাশুড়ি ও দুই সন্তানকে নিয়ে খুপড়ি একটি ঘরে বহু কষ্টে কোনরকম দিন যাপন করছেন তিনি। একটি সরকারি সহায়তা কার্ডের জন্য অনেকবার স্থানীয় জনপ্রতিনিধির কাছে গেছেন। কিন্তু অধরাই রয়ে গেছে কার্ড নামের সেই সোনার হরিণ।

লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার পূর্ব চাঁদখালি গ্রামের বশির আহমেদের ছেলে আবদুর রহিমের সাথে ২০০১ সালে শিউলি আক্তারের বিয়ে হয়। দিনমজুর স্বামীর সংসারে ভালোই কাটছিল তার। হঠাৎ ২০০৬ সালে লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত হন রহিম। এরপর স্থানীয়দের সহযোগিতায় কিছুদিন চিকিৎসা চলে তার। কিন্তু উন্নত চিকিৎসার অভাবে ২০০৯ সালে তিনি মারা যান। পরিবারের উপর্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েন শিউলি।

বেঁচে থাকতে চালিয়ে যান সংগ্রাম। অন‌্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ থেকে শুরু করে ফসলের জমিতেও কাজ করেছেন তিনি। রোজগার হলে চুলায় আগুন জ্বলে, অন্যথায় পেটে আগুন নিয়ে উপস কাটাতে হয়।

এর মধ‌্যেই স্বপ্ন দেখেন ছেলে-মেয়েকে লেখাপড়া শিখিয়ে উচ্চ শিক্ষিত করবেন। তার মেয়ে আঁখি আক্তার বাইশমারা মডেল একাডেমিতে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। ছেলে ইয়াসিন আরাফাত পড়ে দক্ষিণ চাঁদখালি সরকারি প্রাথমিক স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে।

বর্তমানে শিউলি ছেলে, মেয়ে আর শাশুড়িকে নিয়ে নড়বড়ে একটি খুপড়ি ঘরে থাকেন। তার কয়েকটি হাঁস-মুরগি ও দুটি ছাগল রয়েছ। সেগুলোকেও নিজের সন্তানের মতো পালেন তিনি।

শিউলি আক্তার রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘স্বামীর মৃত্যুর পর অনেক কষ্টে দিন যাপন করেছি। মানুষের বাড়িতে ঝি-এর কাজ থেকে ফসলের জমিতেও কাজ করেছি। কিন্তু নারী বলে সঠিক পারিশ্রমিক পাইনি।’

তিনি জানান, শাশুড়ি ছাম্পা বেগমের (৭২) জন্য বয়স্ক ভাতা, বিধবা অথবা দুস্থ ভাতার একটি কার্ডের জন্য বহুবারই স্থানীয় মেম্বার ও চেয়ারম্যানের কাছে ধর্না দিয়েছেন। সবাই আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু সেই কার্ডের দেখা মেলেনি। সরকারি সহায়তার একটি কার্ড পেলে হয়তো কিছুটা কষ্ট লাগব হতো তার।

শিউলি পঞ্চম শ্রেণিও পাস করতে পারেননি। কিন্তু সন্তানদের উচ্চ শিক্ষিত করতে চান এই সংগ্রামী নারী। সন্তানরা পড়ালেখা করে চাকরি করবেন এটাই তার চাওয়া। সন্তানদের পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার জন‌্য তিনি সমাজের হৃদয়বান ব‌্যক্তিদের সহযোগীতা কামনা করেন।

শিউলি আক্তারের মেয়ে আঁখি আক্তার রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘বছরের অধিকাংশ দিনই না খেয়ে স্কুলে যেতে হয়। ক্ষুধায় প্রচুর কষ্ট হয়। তবু মায়ের স্বপ্ন পুরণের জন‌্য লেকাপড়া চালিয়ে যাচ্ছি। সুশিক্ষিত হয়ে সমাজের অসহায়দের সহযোগীতা করতে চাই। যেন অর্থের অভাবে অন্য কোনো পরিবারকে কষ্টে দিন কাটাতে না হয়।’

আবদুস শহিদ নামে স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেন, ক্ষুদা ও দারিদ্রমুক্ত দেশ গড়ার লক্ষ্যে সরকারের দেয়া সহয়তাগুলো অসাধু কয়েকজন জনপ্রতিনিধির কারণে সুষ্ঠুভাবে বণ্টন হয় না। এসব অনিয়ম রোধে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সুদৃষ্টি কামনা করছি।’

লাহারকান্দি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন পাটোয়ারী জানান, শিউলি আক্তারের বিষয়টি তিনি জানেন না। তবে আবেদন পেলে সরকারি সহায়তার ব্যবস্থা কো হবে।

এ ব্যাপারে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শফিকুর রেদোয়ান আরমান শাকিল বলেন, ‘সরকারি সহয়তাগুলো বণ্টনে অনিয়মের সতত্য পাওয়া গেলে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তা ছাড়া ওই নারী যথাযথভাবে আব্নে করলে তার জন্য সরকারি সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে।’ রাইজিংবিডি

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close