সোনার বাংলাদেশ

কিবরিয়া হত্যার বিচার শেষ হয়নি

সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়ার ১৫ম মৃত্যুবার্ষিকী আজ সোমবার। দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে আওয়ামীলীগ অঙ্গ সংগঠন ও কিবরিয়া স্মৃতি পরিষদ।
২০০৫ সালের এই দিন হবিগঞ্জ সদর উপজেলরা বৈদ্যের বাজারে গ্রেনেড হামলায় তিনিসহ ৫ জন নিহত ও কমপক্ষে শতাধিক লোকজন আহত হন। হত্যাকান্ডের সাড়ে ৯ বছর পর সম্পূরক চার্জশীট দাখিলের মাধ্যমে বিচার কাজ শুরু হলেও বিচার নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন নিহতের স্বজনরা।
সূত্রমতে, ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি বিকেলে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার বৈদ্যের বাজারে ঈদ পরবর্তী এক জনসভা শেষে ফেরার পথে গ্রেনেড হামলায় নিহত হন তৎকালীন হবিগঞ্জ-৩ আসনের এমপি সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া। হামলায় নিহত হন শাহ এএমএস কিবরিয়ার ভাতিজা শাহ মনজুরুল হুদা, আওয়ামীলীগ নেতা আব্দুর রহিম, আবুল হোসেন ও সিদ্দিক আলী প্রাণ হারান। আহত হন কমপক্ষে শতাধিক নেতাকর্মী।
এ ঘটনার রাতেই হবিগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও আওয়ামী লীগের জাতীয় পরিষদের সদস্য অ্যাডভোকেট আবদুল মজিদ খান এমপি বাদী হয়ে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দু’টি মামলা দায়ের করেন। মামলার তদন্তে কাজ করে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন সংস্থা।
সিআইডি’র তৎকালীন সহকারী পুলিশ সুপার মুন্সি আতিকুর রহমান মামলাটি তদন্ত করে ১০ জনের বিরুদ্ধে ওই বছরের ২০ মার্চ ১ম অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
অভিযোগপত্র দেয়ার পর মামলার বাদী অ্যাডভোকেট আবদুল মজিদ খান ২০০৬ সালের ৩ মে সিলেট দ্রুত বিচার আদালতে না-রাজি আবেদন করেন। আদালত তার আবেদন খারিজ করলে ১৪ মে তিনি হাইকোর্টে আপিল করেন। আপিলের প্রেক্ষিতে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ সরকারের প্রতি ‘কেন অধিকতর তদন্ত করা যাবে না’ মর্মে রুল জারি করেন। এই রুলের বিরুদ্ধে ২০০৬ সালের ১৮ মে লিভ টু আপিল করে তৎকালিন সরকার। আপিল বিভাগ সরকারের আপিল খারিজ করেন। এরপর ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর এ মামলার অধিকতর তদন্ত শুরু হয়। দায়িত্ব দেয়া হয় সিআইডি’র সহকারী পুলিশ সুপার রফিকুল ইসলামকে।
দীর্ঘ তদন্ত শেষে তিনি ২০১১ সালের ২০ জুন আরও ১৪ জনকে আসামী করে এই আলোচিত মামলার অধিকতর তদন্তের অভিযোগপত্র দাখিল করেন। কিবরিয়া হত্যাকান্ডের সাড়ে ৬ বছর পর লুৎফুজ্জামান বাবর, মুফতি হান্নানসহ ২৪ জনকে আসামী করে অধিকতর তদন্তের অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছিল।
২০১১ সালের ২৮ জুন কিবরিয়ার স্ত্রী আসমা কিবরিয়া চার্জশীটের উপর হবিগঞ্জ জুডিসিয়াল আদালতে না-রাজি আবেদন করেন। আবেদনের প্রেক্ষিতে মামলার মূল নথি সিলেট দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে থাকায় বিচারক রাজিব কুমার বিশ্বাস উপনথির মাধ্যমে আবেদনটি সিলেটে পাঠানোর নির্দেশ দেন। ২০১২ সালের ৫ জানুয়ারি হত্যাকান্ডের অধিকতর তদন্তের অভিযোগপত্রের নারাজি আবেদন গ্রহণ করেন সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক দিলীপ কুমার ভৌমিক। তিনি সিনিয়র পুলিশ অফিসারের মাধ্যমে মামলার অধিকতর তদন্তের জন্য নির্দেশ দেন।
এরপর সিআইডির এএসপি মেহেরুন নেছা দীর্ঘ তদন্ত শেষে সাড়ে ৯ বছর পর ২০১৪ সালের ১৩ নভেম্বর হবিগঞ্জের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট রোকেয়া আক্তারের আদালতে কিবরিয়া হত্যা মামলার ৩য় সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এ অভিযোগপত্রে নতুন ১১ জনকে অন্তর্ভুক্ত করা হলে মামলার আসামী দাঁড়ায় ৩৫-এ। অন্তর্ভুক্ত আসামীরা হলেন-সিলেট সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, হবিগঞ্জ জেলা বিএনপির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক জি কে গউছ, বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, মুফতি আব্দুল হাই, মুফতি তাজ উদ্দিন, মুফতি সফিকুর রহমান, মোহাম্মদ আলী, বদরুল, মহিবুর রহমান, কাজল আহমেদ, হাফেজ ইয়াহিয়া। এর পর ২০১৫ সালের জুনে মামলাটি সিলেট দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে হস্তান্তর করা হয়। এর পর থেকে সেখানে বিচার কার্য শুরু হয়েছে।
মামলায় মোট আসামি ৩২ জনের মধ্যে অন্য একটি মামলায় ৩ আসামির ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। এখন মামলার আসামী ২৯ জন। এর মধ্যে জামিনে আছে ১২ জন। পলাতক ৭ জন এবং হাজতে আছে ১০ জন। বর্তমানে সিলেটে চলছে সাক্ষ্য গ্রহণ। এ পর্যন্ত ৪২ জনের সাক্ষ্য গ্রহন করা হয়েছে।
নিহত আব্দুর রহিমের কন্যা ফাতেমা আক্তার জানান, আমরা ১৫ বছর ধরে পিতৃহারা। ১৫ বছরে বিচারের মুখ দেখতে পারলাম না, আজো বিচার হবে কিনা সন্দেহ আছে। বর্তমান সরকারের আমলেই বাচার কার্য দেখতে চাই। তিনি বলেন, জঘন্য এ হত্যাকান্ডের বিচার হলে অন্ততঃ আমার বাবার আত্মার শান্তি পাবে।
নিহত সিদ্দিক আলীর ছেলে কদ্দুছ মিয়া জানান, ১৫ বছর ধরে বিচার পাই নাই। এ সরকারের আমলে বিচার না হলে আমরা আর যে বিচার পাবো সেই আশা ছেড়ে দিয়েছি। তিনি জানান, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আমাদের দাবী দ্রুত সময়ের মধ্যেই এ মামলার বিচার কাজ শেষ করার।
মামলার বাদী ও আওয়ামীলীগের জাতীয় পরিষদের সদস্য এডভোকেট আব্দুল মজিদ খান এমপি জানান, বিচার নিয়ে আমি হতাশ নই। কেননা এ দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলার বিচার হয়েছে। কাজেই কিবরিয়া হত্যাকান্ডের বিচারও হবে। তিনি বলেন, ক্রিমিনাল কোর্টের মামলা অনেক সময় সঙ্গত কারণে মামলার সাক্ষ্য গ্রহন পিছিয়ে যায়। তিনি বলেন, কিবরিয়া হত্যাকান্ডের বিচার বাংলার মাটিতে হতে হবে। বিচারের মাধ্যমে আমরা প্রমাণ করতে চাই এ দেশে কোন হত্যাকান্ডের বিচার না হয়ে থাকে না। বিচার হবে এবং দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
মরহুম শাহ এএমএস কিবরিয়ার ছেলে ড. রেজা কিবরিয়া তার বাবার হত্যা মামলা প্রসঙ্গে বলেন, ‘এখনো ঠিকমত তদন্ত হয়নি এবং ৩টি মিথ্যা চার্জশীট দেয়া হয়েছে। একটির সাথে আরেকটার কোন সম্পর্ক নেই। দুটি গুরুত্বপূর্ন প্রশ্নের উত্তর তদন্তকারী কর্মকর্তারা দিতে চায়নি। আসল মদদদাতা কারা এবং গ্রেনেডের উৎস্য কি। আমরা ২০০৫ সাল থেকে বলে আসছি-মিথ্যা তদন্তের ভিত্তিতে কোন চার্জশীট আমরা মানি না এবং মিথ্যা তদন্তে বিচার হলে আমরা মানব না।’ এদিকে, সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়ার ১৫তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকা ও হবিগঞ্জে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।
গৃহীত কর্মসূচির মধ্য রয়েছে, আজ ২৭ জানুয়ারি হবিগঞ্জের বৈদ্যের বাজারে স্মৃতিস্তম্ভে পুস্পস্তবক অর্পণ, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, শোক র‌্যালি, দোয়া মাহফিল ও আলোচনা সভা। পৃথকভাবে এ কর্মসূচিগুলো পালন করবে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠন এবং কিবরিয়া স্মৃতি সংসদ। এছাড়া, ঢাকার বনানীতে অবস্থিত মরহুমের কবরে সকাল ১১টায় পুস্পস্তবক অর্পণ করবে কিবরিয়া পরিবার।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close