ইংল্যান্ডটপ স্টোরিজপ্রবাসে সফল বাঙালীফিচার

লন্ডনে যাপিত জীবন : ২০ বিশ্ব রেকর্ড সৃষ্টি করেছেন ওলি খান

সাঈদ চৌধুরী:

গিনেস বিশ্ব রেকর্ড সৃষ্টি করা সেলিব্রেটি শেফ ওলি খান বিলেতের কারি ইন্ডাস্ট্রিতে এক উজ্জল তারকা। গত তিন দশক ধরে একের পর এক রেকর্ড সৃষ্টি করে চলেছেন তিনি। বাংলাদেশ ক্যাটারার্স এসোসিয়েশনের (বিসিএ) সাবেক সেক্রেটারি ও বর্তমান সিনিয়র সহ-সভাপতি ওলি খান বৃটিশ বাংলাদেশ বিজনেস ফোরামের (বিবিবিএফ) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও সহ-সভাপতি। এছাড়াও তিনি ইউকে বাংলাদেশ ক্যাটালিস্ট অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ইউকেবিসিসিআই) পরিচালক।

আজ থেকে ১৯ বছর আগে সাপ্তাহিক ইউরো বাংলা প্রতিষ্ঠার সময় বাংলাদেশী রেষ্টুরেন্ট সমূহে নান্দনিক খাবার পরিবেশন নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন তৈরী কালে ওলি খান চমৎকার রেসিপি বর্ণনা করেছিলেন্। তখন থেকে যে সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল তা আজো রয়েছে অম্লান।

অত্যন্ত বিনয়ী, সদালাপী ও বন্ধুবৎসল ওলি খান ২০০৩ সালে আমার সম্পাদনায় মিডিয়া মহল থেকে প্রকাশিত ’ইউকে বাংলা ডাইরেক্টরি’ এবং ২০০৮ সালে বৃটেনের সকল এশিয়ান রেষ্টুরেন্ট নিয়ে আমার সম্পাদিত ’ইউকে এশিয়ান রেষ্টুরেন্ট ডাইরেক্টরি’ প্রকাশকালে সামগ্রীক সহায়তা করেছেন। কারি ইন্ডাস্ট্রির বিকাশে বিসিএ’র প্রচার কর্মকান্ডে আমিও সাধ্যমত তাদের সহায়তা করেছি।

২০১৮ সালের ১০ জুলাই মঙ্গলবার বৃটিশ পার্লামেন্টের সামনে বাংলাদেশ ক্যাটারার্স এসোসিয়েশন (বিসিএ) বিশাল বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। সংগঠনের সভাপতি কামাল ইয়াকুব ও সাধারণ সম্পাদক ওলি খানের নেতৃত্বে এই জনসমাগম বেশ সাড়া জাগিয়েছিল। গ্রেট বৃটেনের প্রায় সকল প্রান্ত থেকে ৪/৫ হাজার রেস্টুরেন্ট মালিক ও শ্রমিক এই বিক্ষোভে অংশগ্রহণ করেন।

সমাবেশে বিলেতে বাংলাদেশী রেস্টুরেন্ট সমূহে জনবল সংকট মোকাবিলা এবং সহজ নিয়মে ওয়ার্ক পারমিট প্রদান সহ বিভিন্ন দাবি উপস্থাপন করা হয়। এই সমস্যা সমধানের যৌক্তিক দাবি দ্রুত মেনে নেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানানো হয়। বিসিএ‘র সাবেক সভাপতি পাশা খন্দকার ও সাধারণ সম্পাদক বর্তমান সভাপতি এম এ মুমিন সহ সংগঠনের সর্বস্তরের নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। দক্ষ সংগঠক ওলি খান বিসিএ‘র সেক্রেটারি হিসেবে বেশ সফলতা দেখিয়েছেন।

ওলি খান সম্প্রতি গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ড সৃষ্টি করে কমিউনিটিতে ঝড় তুলেছেন। তৈরী করেছেন ১৭৫.৪৮ কেজি ওজনের অনিয়ন ভাজি। সাধারণ্যে যেটা পেঁয়াজু হিসেবেই সুপরিচিত। গত ফেব্রুয়ারি মাসে লন্ডন মুসলিম সেন্টারে অনুষ্ঠিত হয় বিশ্বময় আলোচিত এই অনুষ্ঠান। আট ঘণ্টা সময়ে ৫০০ লিটার তেলে এই পেঁয়াজু তৈরী করে দর্শক, বিচারক ও নিরাপদ খাদ্য বিশেষজ্ঞদের তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন তিনি।

১৭৫.৪৮ কেজি ওজনের পেঁয়াজু তৈরির আগে গিনেস বুকে সবচেয়ে বড় পেঁয়াজু তৈরির রেকর্ড ছিল ১০২ দশমিক ২ কেজির। ২০১১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ব্র্যাডফোর্ড কলেজের একদল শিক্ষার্থী স্থানীয় প্রসাদ রেস্তোরাঁর সহযোগিতায় এই রেকর্ড গড়ে ছিলেন। ওলি খান সে রেকর্ড অতিক্রম করে অনেক উচ্চতায় সৃষ্টি করেছেন নতুন রেকর্ড। এ প্রচেষ্টায় সহায়তা করেছে অনলাইন খাবার সরবরাহকারী কোম্পানি জাস্ট ইট। সেবা কর্মের অংশ হিসেবে এ উপলক্ষে ইস্ট লন্ডন মস্ক ট্রাস্ট চ্যারিটির জন্য তহবিল সংগ্রহ এবং হোমলেস সহ প্রায় ১ হাজার মানুষের মাঝে এই পেঁয়াজু বিতিরণ করা হয়।

আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত ও পুরষ্কারপ্রাপ্ত ওলি খান অত্যন্ত সৃজনশীল রেসিপি ও উন্নত মানের স্বাস্থ্যবিধি রক্ষা করে মজাদার রান্না-বান্নার জন্য বহু পুরষ্কার জিতেছেন। বিসিএ সুবর্ণ জয়ন্তীতে তাঁকে ২০১০ সালের সেরা ক্যাটারার নির্বাচিত করা হয়। ২০১৪ সালে কারি লাইফ বিজনেস এওয়ার্ডস লাভ করেন তিনি। ২০১৫ সালে রয়েল সোসাইটি অব আর্ট (এফআরএসএ) ফেলো ঘোষিত হন। কুইন এন্ড কমনওয়েলথ নাইনটি গ্লোরিয়াস ইয়ার্স উৎযাপন উপলক্ষে প্রকাশিত ম্যাগাজিনে একমাত্র বাংলাদেশী হিসেবে ওলি খানের বার্তা প্রকাশিত হয়েছে।

বিবিসি, স্কাই নিউজ, আইটিভি, সিবিসি, সিএনএন, টিআরটি ওয়ার্ল্ড, কানাডিয়ান টিভি, টিভি টোকিও, সিটিভি’র মতো ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া এবং ফিনান্সিয়াল টাইম, দ্য গার্ডিয়ান, ডেইলি মেল, ইভিনিং স্ট্যান্ডার্ড, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, ইকনমিস্ট, ওয়াশিংটন পোস্ট, ইনডিপেন্ডেন্ট, ডেইলি মিরর, ডেইলি স্টার, দ্য টেলিগ্রাফ, দ্য সান, দ্য গ্লোবাল পোস্ট, ইউএসএ টুডে সহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে মজাদার ও স্বাস্থ্যপ্রদ রান্না সম্পর্কে অনেক বক্তব্য তুলে ধরেছেন তিনি।

ওলি খান তার প্রতিষ্ঠিত ওলি ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে নিজ মাতৃভূমি বাংলাদেশ এবং আবাসভূমি বিলেতের সামাজিক সেবামূলক জনহিতকর কাজে সর্বদা সক্রিয়। ছোটবেলা থেকেই দাতব্য কাজের প্রতি তিনি ছিলেন অত্যন্ত নিবেদিত এবং প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া মহামারী করোনাভাইরাস বৃটেনও সমভাবে প্রত্যক্ষ করছে। এ অবস্থায় ওলি খান ও স্টিভেনেজে অবস্থিত সুরমা টেকওয়ে ৫০০০ মানুষকে খাবার সরবরাহ করছেন।

গত ১২ সপ্তাহ ধরে স্টিভেনজের লিস্টার হাসপাতালে, ওয়েলউইনের গার্ডেন সিটি এলাকার কিউ-ইটু হাসপাতাল, গ্রেট অর্মন্ড স্ট্রিট হাসপাতাল (জিওএসএইচ), রয়েল ফ্রি হাসপাতাল হ্যাম্পস্টেড, ফিঞ্চলে মেমোরিয়াল হাসপাতাল, দ্য রয়েল লন্ডন হসপিটাল, হুইটিংটন হাসপাতাল, সেন্ট বার্থলোমিউ হাসপাতাল সহ বিভিন্ন স্থানে এনএইচএস ফ্রন্ট লাইনের কর্মী, কেয়ার হোমস, অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, ডাকম্যান, বিন কর্মী এবং প্রতিবন্ধী মানুষদের মধ্যে খাবার বিতরণ করা হচ্ছে।

এছাড়া তিনি ইস্ট এন্ড নর্থ হার্টফোর্ডশায়ার এনএইচএস ট্রাস্ট আয়োজিত রমজান বিগ ইফতারে খাদ্য সরবরাহ করেছেন।

ওলি খান সুপরিচিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বার্কিং এন্ড ডেগেনহ্যাম কলেজ, কেমব্রিজ রিজিওনাল কলেজ এবং হার্টফোর্ডশায়ার কলেজ সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে রান্না প্রশিক্ষণ কোর্স পরিচালনা করেছেন।

একাধিক মান সম্পন্ন রেস্তোরাঁর সত্তাধিকারী কিংবদন্তি সেফ ওলি খান প্রপার্টি ব্যবসায়ও বেশ সফলতা লাভ করেছেন। সফট ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড ও জস রিয়েল এস্টেট লিমিটেডের অন্যতম উদ্যোক্তা তিনি।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close