ধর্ম

কিয়ামুল লাইল : বায়তুল্লাহে প্রাণের স্পন্দন

সাঈদ চৌধুরী :
কাবা শরীফ মহান আল্লাহ তায়ালার এক অপূর্ব সৃষ্টি। আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতারা পৃথিবীতে সর্বপ্রথম কাবাঘর নির্মাণ করেন। আল্লাহর আরশে মুয়াল্লার ছায়াতলে সোজাসুজি বায়তুল মামুরের আকৃতি অনুসারে স্থাপন করা হয়েছে।
কাবাঘরকে লক্ষ্য করে মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনের সূরা আল-ইমরানের ৯৬ নম্বর আয়াতে বলেন,
إِنَّ أَوَّلَ بَيْتٍ وُضِعَ لِلنَّاسِ لَلَّذِي بِبَكَّةَ مُبَارَكًا وَهُدًى لِّلْعَالَمِينَ
নিঃসন্দেহে সর্বপ্রথম ঘর যা মানুষের জন্যে নির্ধারিত হয়েছে, সেটাই হচ্ছে এ ঘর, যা মক্কায় অবস্থিত এবং সারা জাহানের মানুষের জন্য হেদায়েত ও বরকতময়।
সারা পৃথিবী থেকে হাজার হাজার মুসলমান রামাদ্বান মাসে মাক্কাতুল মুকাররামাহ এসে হাজির হন। পবিত্র কুরআন নাজিলের মাসে বায়তুল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহর ঘরে কালামে পাকের তেলাওয়াতে শরীক হন। যে শহরে এই পবিত্র গ্রন্থ অবতীর্ণ হয়েছে, সেখানে কিয়ামুল লাইলে কাবার ইমামের প্রাণ জুড়ানো কন্ঠে তেলা্ওয়াত অন্তর মনে এক ভিন্ন আবহ তৈরী করে। সৃষ্টি হয় প্রাণের স্পন্দন। রেখাপাত করে হৃদয়ের গভীরে। মনে হয় যেন এখনই এই বানী অবতীর্ণ হচ্ছে।
বড় ভাইজান ডা. শাব্বির আহমদ চৌধুরী বহু বছর এখানে ছিলেন। সেঝো ভাইজান মাওলানা ফায়্যাজ আহমদ চৌধুরী ও আমি ১৯৮৫ সালের রামাদ্বান মাসে প্রথম গিয়েছি। এরপর অবশ্য আরো কয়েকবার যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে। এমন একটি সুযোগ পেয়ে মহান রবের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ।
বায়তুল্লাহ শরীফের অভিজ্ঞতা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। সে এক গভীর অনুভূতি। কাবা ঘরে সুরভি-সৌরভ মন্ডিত ঔজ্জ্বল্য আলোর দীপ্তি আর কিয়ামুল লাইল তথা রাতের এবাদত তুলনা রহিত। বিশেষ করে উতিরের শেষ রাকাতে দু’হাত তুলে হৃদয়গ্রাহী ক্ষমা প্রার্থনার গগন বিদারী নিনাদ মহান মাবুদ নিশ্চয়ই ফিরিয়ে দেবেন না। দীর্ঘ মুনাজাতে মুসল্লিদের ক্রন্দন রুল আকাশ বিদীর্ণ হয়ে আরশে আজীমে পৌছে যায়।
মহাগ্রন্থ আল কুরআনে কিয়ামুল লাইল তথা রাতের এবাদত সম্পর্কে বহু ভাবে বর্ণনা এসেছে-
لَيْسُواْ سَوَاء مِّنْ أَهْلِ الْكِتَابِ أُمَّةٌ قَآئِمَةٌ يَتْلُونَ آيَاتِ اللّهِ آنَاء اللَّيْلِ وَهُمْ يَسْجُدُونَ
তারা সবাই সমান নয়। আহলে কিতাবদের মধ্যে কিছু লোক এমনও আছে যারা অবিচলভাবে আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করে এবং রাতের গভীরে তারা সেজদা করে। (সুরা ইমরান ৩: ১১৩)
الصَّابِرِينَ وَالصَّادِقِينَ وَالْقَانِتِينَ وَالْمُنفِقِينَ وَالْمُسْتَغْفِرِينَ بِالأَسْحَارِ
তারা ধৈর্য্যধারণকারী, সত্যবাদী, নির্দেশ সম্পাদনকারী, সৎপথে ব্যয়কারী এবং শেষরাতে ক্ষমা প্রার্থনাকারী। (সুরা ইমরান ৩: ১১৭)
وَمِنَ اللَّيْلِ فَتَهَجَّدْ بِهِ نَافِلَةً لَّكَ عَسَى أَن يَبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَّحْمُودًا
রাত্রির কিছু অংশ কোরআন পাঠ সহ জাগ্রত থাকুন। এটা আপনার জন্যে অতিরিক্ত। হয়ত বা আপনার পালনকর্তা আপনাকে মোকামে মাহমুদে পৌঁছাবেন। (সুরা বনিইসরাইল ১৭:৭৯)
وَالَّذِينَ يَبِيتُونَ لِرَبِّهِمْ سُجَّدًا وَقِيَامًا
এবং যারা রাত্রি যাপন করে পালনকর্তার উদ্দেশ্যে সেজদাবনত হয়ে ও দন্ডায়মান হয়ে। (সুরা ফুরকান ২৫: ৬৪)
أَمَّنْ هُوَ قَانِتٌ آنَاء اللَّيْلِ سَاجِدًا وَقَائِمًا يَحْذَرُ الْآخِرَةَ وَيَرْجُو رَحْمَةَ رَبِّهِ قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُوْلُوا الْأَلْبَابِ
যে ব্যক্তি রাত্রিকালে সেজদার মাধ্যমে অথবা দাঁড়িয়ে এবাদত করে, পরকালের আশংকা রাখে এবং তার পালনকর্তার রহমত প্রত্যাশা করে, সে কি তার সমান, যে এরূপ করে না। বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান হতে পারে? চিন্তা-ভাবনা কেবল তারাই করে, যারা বুদ্ধিমান। (সুরা যুমার ৩৯:৯)
كَانُوا قَلِيلًا مِّنَ اللَّيْلِ مَا يَهْجَعُونَ
তারা রাত্রির সামান্য অংশেই নিদ্রা যেত। (সুরা যারিয়াহ ৫১:১৭)
وَبِالْأَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُونَ
রাতের শেষ প্রহরে তারা ক্ষমাপ্রার্থনা করত। (সুরা যারিয়াহ ৫১:১৮)
وَمِنَ اللَّيْلِ فَسَبِّحْهُ وَإِدْبَارَ النُّجُومِ
এবং রাত্রির কিছু অংশে এবং তারকা অস্তমিত হওয়ার সময় তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করুন। (সুরা তুর ৫২:৪৯)।
يَا أَيُّهَا الْمُزَّمِّلُ
হে বস্ত্রাবৃত!
قُمِ اللَّيْلَ إِلَّا قَلِيلًا
রাত্রিতে দন্ডায়মান হোন কিছু অংশ বাদ দিয়ে
نِصْفَهُ أَوِ انقُصْ مِنْهُ قَلِيلًا
অর্ধরাত্রি অথবা তদপেক্ষা কিছু কম
أَوْ زِدْ عَلَيْهِ وَرَتِّلِ الْقُرْآنَ تَرْتِيلًا
অথবা তদপেক্ষা বেশী এবং কোরআন আবৃত্তি করুন সুবিন্যস্ত ভাবে ও স্পষ্টভাবে।
إِنَّا سَنُلْقِي عَلَيْكَ قَوْلًا ثَقِيلًا
আমি আপনার প্রতি অবতীর্ণ করেছি গুরুত্বপূর্ণ বাণী। (সুরা মুযাম্মিল ৭৩: ১-৫)
وَمِنَ اللَّيْلِ فَاسْجُدْ لَهُ وَسَبِّحْهُ لَيْلًا طَوِيلًا
রাত্রির কিছু অংশে তাঁর উদ্দেশে সিজদা করুন এবং রাত্রির দীর্ঘ সময় তাঁর পবিত্রতা বর্ণনা করুন (সুরা দাহ’র ৭৬:২৬)।
হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) এরশাদ করেছেন- কোনো ব্যক্তি তার ঘরে নামাজ আদায় করলে সে এক নামাজেরই সওয়াব পাবে, মহল্লার (পাঞ্জেগানা) মসজিদে আদায় করলে পচিঁশ গুণ বেশি পাবে, জামে মসজিদে আদায় করলে পাঁচ শত নামাজের সওয়াব পাবে, বায়তুল মুকাদ্দাসে আদায় করলে একহাজার নামাজের সওয়াব পাবে, আমার মসজিদে অর্থাৎ মসজিদে নববীতে আদায় করলে পঞ্চাশ হাজার নামাজের সওয়াব পাবে। আর মক্কা শরীফের মসজিদে আদায় করলে এক লক্ষ নামাজের সওয়াব পাবে। (ইবনে মাজাহ)
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি মক্কাতে রামাযান মাস পেল, অত:পর সে পূর্ণ মাসের রোযা রাখল ও সাধ্যনুযায়ী কিয়ামুল লাইল করল, আল্লাহ তাকে এক লক্ষ রামাযান মাসের রোযা রাখার সওয়াব দান করবেন। প্রতিদিনে তাকে একটা নেকী দিবেন, প্রতিরাতে একটা নেকী দিবেন। প্রতিদিন ও রাত এক একটি গোলাম আযাদ করার সওয়াব দান করবেন। প্রতিদিন ও রাত আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে এক একটি ঘোড়া (বাহন) দান করার সওয়াব দান করবেন এবং প্রতিদিন তার একটা দুআ কবুল করবেন। (বায়হাকী)
কাবা ঘরে কিয়ামুল লাইল রাতের গভীরে নিবিড় মনে মহান রবের কাছে সাজদাহ্ অবনত হয়ে সঠিক পথের দিশা ও ক্ষমা ভিক্ষা চাওয়ার এক অপূর্ব সুযোগ। কাবা ঘর মহান প্রভুর কাছে হাজিরা দেয়ার এক মহা মিলন কেন্দ্র।
(চলবে)

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

আরও দেখুন...

Close
Close