ফিচার

রঙিন মাছ চাষে জাবি ছাত্রের সফলতা

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ওয়াসেক ফয়সাল। তিনি প্রায় এক বছর যাবত রঙিন মাছ চাষ করছেন। এই মাছ চাষ করেই পেয়েছেন সফলতা। তিনি স্বপ্ন দেখেছেন বড় একটি খামার করার।

শুক্রবার সকালে তার বাড়িতে গেলে দেখা যায়, তরুণ উদ্যোক্তা ওয়াসেক ফয়সালের বাড়ির আঙিনায় ছোট ছোট প্লাস্টিক, মাটির পাত্র, ইট দিয়ে তৈরি চৌবাচ্চায় রাখা পানিতে ভাসছে নানা রঙের রঙিন মাছ। এর মধ্যে লাল, নীল, কমলা, কালো, বাদামি, হলুদ রঙের মাছের ছড়াছড়ি। গোল্ড ফিশ, গাপ্পি, বিভিন্ন রঙের চিংড়ি, রেড ক্যাপ, মলি, বেলুন মলি এছাড়াও অনেক ধরনের মাছ। এই মাছ দেখলে যেমন চোখ জুড়ায়, তেমন মন ভরে যায়।

বাড়ির প্লাস্টিকের ছোট ছোট গ্লাসে ও অ্যাকুরিয়ামে শোভা পাচ্ছে এই রঙিন মাছ। এই রঙিন মাছের চাষ তার জীবনকে রাঙিয়ে দেবে বলে ফয়সালের বিশ্বাস। এই মাছ চাষের মাধ্যমে তিনি নিজের পাশাপাশি ছোট বোন তুরিনের পড়ালেখার খরচ জোগাচ্ছেন। ফলে বাবাকে আর কষ্ট করে সন্তানদের পড়ার খরচ জোগাড় করতে হচ্ছে না।

ওয়াসেক রাজশাহীর বাঘা উপজেলার গাওপাড়া গ্রামের একমাত্র তসিকুল ইসলামের ছেলে। তিনি ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের এমএসসির ছাত্র। বোন তুরিন বাঘা রহমতউল্লা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে।

ওয়াসেক ফয়সাল জানান, ২০১৯ সালের এপ্রিল মাস থেকে বাড়ির আঙিনায় ছোট্ট পরিসরে গড়ে তোলেন একটি ফিশ ফার্ম। পোনা কেনা, খাবার দেয়াসহ নানা কাজে তার প্রথমে খরচ হয়েছিল ৪ হাজার টাকা। বছর ঘুরতেই মাছ বিক্রি করেছেন প্রায় ৮০ হাজার টাকার। ইতোমধ্যেই ব্যবসা আরেকটু সম্প্রসারিত করেন।

তিনি জানান, এ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রঙিন মাছে ব্যবহৃত শোভাবর্ধনকারী বিভিন্ন প্রকার পানির নিচে থাকা গাছ। গাছের মধ্যে রয়েছে অক্টোপাস, কোবাম্বা, এম্বুলিয়া, স্টারপ্র্যাস, ফগবিট, ডেন্সাসহ আরও ৯০ রকমের গাছ। এই গাছ একটি ডোগা বিক্রি হয় ৫ টাকা থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত। এতেও তিনি পেয়েছেন সফলতা।

ফয়সাল জানান, অ্যাকুরিয়ামের দোকানে রঙিন মাছ দেখে ভীষণ ভালো লাগে তার। কৌতূহলী হয়ে মাছের দাম জানতে চান। জানতে পারেন মাছগুলো বেশ দামি। রঙিন মাছগুলো বিদেশ থেকে আনা হয়। বর্তমানে দেশে এ মাছের চাষ হচ্ছে। সেখান থেকেই রঙিন মাছ চাষের পরিকল্পনা মাথায় আসে।

বছরের শুরুতে মাটির তৈরি চারিতে অল্প কয়েকটি রঙিন মাছ ছাড়েন ওয়াসেক ফয়সাল। দুই মাসের মধ্যে মাছগুলো বেশ বড় হয়ে যায়। রঙিন মাছগুলো বড় হওয়ার পর তার উৎসাহ বেড়ে যায়। তখন আরও বিভিন্ন প্রজাতির মা মাছ সংগ্রহ করেন দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে। এই মাছ বড় করতে তাকে আরও পাঁচটি চৌবাচ্চা তৈরি করতে হয়।

২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে ছয়টি চৌবাচ্চায় রেণু ছাড়া হয়। অধিকাংশ চৌবাচ্চা চার ফুট দৈর্ঘ্য ও তিন ফুট প্রস্থের। এরপর মাছগুলো বড় হতে থাকে। একপর্যায়ে ডিম দেয়। ডিম থেকে রেণুপোনা উৎপাদিত হয়, যা বাজারে বিক্রি করেন। যারা অ্যাকুরিয়াম ব্যবসা করেন, তারা অনেকেই এখন তার থেকে এই মাছ ক্রয় করেন।

ওয়াসেক ফয়সাল আরও জানান, চলতি মাসের শুরুতে তিনি ছয়টি চৌবাচ্চার পাশাপাশি আরও কিছু নতুন চৌবাচ্চা তৈরি করে মাছের চাষ করছেন। যেখানে তিনি দেড় শতাধিক মা মাছ আর অর্ধশতাধিক পুরুষ মাছ ছেড়েছেন। তিন থেকে চার মাসের মধ্যে এগুলো বড় হবে। তখন চৌবাচ্চায় দিয়ে ডিম ফোটাবেন। তারপর রেণু বিক্রি করবেন।

তিনি আশা করছেন, এবার দেড় থেকে দুই লাখ টাকার রঙিন মাছ বিক্রি করতে পারবেন।

বর্তমানে খামারে গোল্ড ফিশ, কমেট, কই কার্ভ, ওরেন্টা গোল্ড, সিল্কি কই, মলি, গাপ্পি, রঙিন চিংড়ি, প্লাটিসহ ২০ প্রজাতির মা মাছ রয়েছে। একটি মাছ বছরে প্রায় এক হাজার রেণু পোনা দেবে। তিন থেকে চার ইঞ্চি বড় হলে এই মাছ বিক্রি করা যাবে।

ফয়সালের মা ফরিদা বেগম বলেন, শুরুতে এলাকার মানুষসহ অনেক বন্ধুরাও এই চাষ দেখে হাসাহাসি করতেন এবং বিভিন্নভাবে মজা করতেন। সবাই মনে করতেন এটা খেয়ালিপনা। কিন্তু হাল ছাড়িনি। এখন এলাকার মানুষ ছাড়াও মৎস্য কর্মকর্তারা এই মাছ দেখতে আসছেন। অনেকে খামার দেখতে এসে মাছ কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। তার ছেলের ফেসবুক পেইজ এবং ওয়েবসাইট আছে; যার মাধ্যমে এ ব্যবসাকে আরও সম্প্রসারিত করেছে।

সফল ফয়সাল শুধু রঙিন মাছ চাষেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। তার বাড়ির আঙিনাতে পরিবারের সহায়তায় গরু পালন, হাঁস, দেশি মুরগি, কক মুরগি, দেশি-বিদেশি কবুতর, ছাগল এমনকি কচ্ছপ পালন শুরু করেছেন। পাশাপাশি টিয়া পাখিও পালন করছেন। তবে কবুতরের মধ্যে রয়েছে- লক্ষা, ময়ূরী, সিরাজি, হুমার, ডাউক, লোটন, বম্বায়, শটফেজ, ঢাকায় গিরিবাজ।

প্রতিটির জন্য আলাদা শেড ঘর তৈরি করা হয়েছে। পরিচর্যার জন্য আলাদা কোনো লোক নেই। ফয়সাল যখন থাকেন না, তখন তার ছোট বোন তুরিন পরিচর্যা করে। পাশাপাশি মা-বাবা সহযোগিতা করেন।

এ বিষয়ে উপজেলা ভারপ্রাপ্ত মৎস্য কর্মকর্তা আমিরুল ইসলাম বলেন, এটি একটি ভালো উদ্যোগ। এই মাছ চাষে সরকারিভাবে প্রশিক্ষণ ও সহজ ঋণের ব্যবস্থা থাকলে আরও ভালো করতে পারত ফয়সাল। সঠিক পরিচর্যা থাকলে এই খামার জীবনকে বদলে দেবে ফয়সালের। আমি তার রঙিন মাছের চাষ দেখেছি। ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ভালো লেগেছে।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close