খেলাধুলা

অবসর নিতে বাধ্য করা হয়েছিল মাশরাফিকে!

সামাজিক যোগযোগমাধ্যম ফেসবুকে সাকিব আল হাসানের একটি সাক্ষাৎকার নিয়ে আলোচনা সমালোচনা যেখানে থামছেই না, সেখানে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড’র (বিসিবি) নানা অসঙ্গতি নিয়ে মুখ খুলেছেন সাবেক অধিনায়ক মাশরাফি বিন মোর্ত্তজা। মঙ্গলবার একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিসিবির দায়িত্বে থাকাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে অবাক হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন তিনি।

ধারাবাহিক সেই সাক্ষাৎকার থেকে আজ জানা গেল- বিসিবির চাপেই অবসর নিয়েছিলেন মাশরাফি! ওই টেলিভিশনটির ক্রীড়া সাংবাদিকদের করা বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন মাশরাফি। সেখানেই তিনি এ কথা বলেছেন।

২০১৭ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সফরে হঠাৎ অবসরের ঘোষণা দেন মাশরাফি। অবসর নিতে তাকে বাধ্য করা হয়েছিল কিনা প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘স্রেফ আমাকে ওখানেই করতে হতো। এমন সিচুয়েশন তৈরি করা হয়েছিল যে আমাকে করতে হতো।’ বিস্তারিত না বললেও মাশরাফি বলেন, ‘সিদ্ধান্ত আমাকে নিতে হয়েছে।’

এ সময় সাংবাদিকদের উল্টো প্রশ্ন করেন মাশরাফি। ক্রীড়া সাংবাদিকদের মধ্যে কেউ ২০১৭ সালে শ্রীলঙ্কা সিরিজ কভারে গিয়েছিল কিনা প্রশ্ন করলে এক সাংবাদিক জানান তিনি গিয়েছিলেন। মাশরাফি তখন আবার প্রশ্ন করেন, শ্রীলঙ্কায় আপনি কী ক্রিকেট বোর্ডের সবাইকে দেখেছিলেন? অলমোস্ট বিগ বিগ পার্সনদের। লবিতে, মিটিংয়ে? ওই সাংবাদিক ‘হ্যা’ সূচক উত্তর দিলে মাশরাফি বলেন, ‘দ্যাটস ইট।’

এ সময় তিনি আক্ষেপ নিয়ে বলেন, ‘আমি কার থেকে সহযোগিতা পেয়েছি বলেন তো..আমার টাইমে? আমি ২০১১ বিশ্বকাপে ইনজুরিতে ডাক্তার ক্লিয়ারেন্স দেওয়ার পরও আমাকে নেওয়া হয়নি। আমি সহযোগিতা পাইনি। পরে আমি ২০১৭তে যখন অবসরে গেলাম তখন আমি কিন্তু এসে কাউকে বলিনি। শুধু দেশের মানুষই আমার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। মিডিয়ার মানুষও ছিল। কারণটা কী? আমি কিন্তু কিছুই বলিনি।’

অবসরের সিদ্ধান্তটা শ্রীলঙ্কাতেই হয়েছিল কিনা প্রশ্নের উত্তরে দেশ সেরা অধিনায়ক বলেন, ‘আমি যখন শ্রীলঙ্কাতে যাই, তখনও আমি ট্রাভেল টি শার্ট-প্যান্ট খুলি নাই। তখনই আমার সঙ্গে নিচে একটা মিটিং হয়। মিটিংয়ের পর আমি রিয়েলাইজ করি যে সামথিং ইজ রং। টি-টোয়েন্টি সিরিজটা যখনই আসে তখনি একটা সমস্যা আসে। আমার সিদ্ধান্তগুলো কিন্তু হুট করে হয়। টি-টোয়েন্টিতে যখন আমি রিয়েলাইজড করি, না সবার এগেইন্সটে থাকার দরকার নাই।’

এ সময় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘একটা প্রশ্ন করতে পারেন, তখন কেন আপনি ওয়ানডে থেকে রিটার্ডমেন্টে গেলেন না? এই সিদ্ধান্তটা না নেওয়ার কারণ হলো আমিও একজন খেলোয়ার।’

আনুষ্ঠানিক অবসরের বিষয়ে বিসিবি কোনো প্রস্তাব দিয়েছে কিনা বা আনুষ্ঠানিকভাবে অনেকবার কথা হলেও মাশরাফি সায় দিচ্ছেন না, এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কে কথা বলেছে আনুষ্ঠানিকভাবে? আনুষ্ঠানিকভাবে কোথায় হয়েছে, আনুষ্ঠানিকভাবে হলে যেটা হয়, সারা বিশ্বের আনুষ্ঠানিকতা কীভাবে হয় জানেন না? আজকে পাপন ভাইয়ের দোষ কেন হবে, এখানে তো বোর্ড প্রেসিডেন্টের ডাকার কথা না। সবার আগে সিলেক্টর এবং কোচ কথা বলবে। ওকে ফাইন; তুমি বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য ১৮-২০ বছর খেলেছো। সামনে আগাতে চাই। সামনে বিশ্বকাপে খেলবো না এটাইতো দাঁড় করানো হয়েছিল। নির্দিষ্ট একটি ম্যাচ আছে। তুমি খেলে সরে যেতে পারো। যদি না খেলতে পারো, তুমি যেহেতু বলেছো যে রিটায়ার করতে পারবে না, সো তুমি তোমার কল নিতে পারো। আমরা তোমাদের অফিসিয়ালি জানিয়ে দেবো। অফিসিয়ালি মিডিয়ায় এসে জানানোর কি আছে? আপনি মিডিয়া আপনাকে অফিসিয়ালি জানাবে কেন? এটা কি কোনো প্রফেশনাল ওয়ে? আপনারা যখন প্রফেশনালের কথা বলছেন তখন প্রফেশনালের বুলিটা হলো এরকম যে, হয় কোচ কথা বলবে, না হয় সিলেক্টররা কথা বলবে, মাশরাফিকে ডাকবে এসে কথা বলবে, দেখো মাশরাফি আমাদের সিদ্ধান্ত এটা। তারপরও আমি সবসময় বলে এসেছি পাপন ভাইয়ের সাথে।’

মাশরাফি আরও বলেন, ‘জিম্বাবুয়ে সিরিজের সময় উনি (পাপন) আমাকে ডেকে বলেছিলেন যে, আমরা অ্যারেঞ্জ করতে যাচ্ছি তাও উনি সরাসরি বলতে পারছিলেন না। এটা বলাও কঠিন আর একজনের জন্য। কিন্তু আপনি যখন প্রফেশনাল হবেন তখন প্রফেশনাল ইজ প্রফেশনালিজম।’

বিশ্বকাপে অবসর বিতর্ক ঠিক কি ঘটেছিল? মাশরাফি আসলে লাস্ট ম্যাচ খেলতে চাননি, আবার হুট করে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি খেলতে চান.. এর পেছনের কারণে জানতে চাইলে ম্যাশ বলেন, ‘সাকিব ইজ দ্যা ফার্স্ট পারসন যার সামনে আমি খেলবো আবার খেলবো না কথাটি বলেছিলাম। ৪ বার আমি কথাটি বলেছি, কিন্তু সেটা ম্যানেজ করার জন্য না। সাকিবের মেনটালিটি কি অবস্থায় আছে সেটা জানার জন্য। আমার আসলে দায়িত্ব ছিল। সাকিব কীভাবে নিচ্ছে, একইসঙ্গে টিমমেটস। তখন আমি মিটিংয়ে টিমমেটসদের বললাম যে- দেখো আমি খেলছি।’

বোর্ড জানতো মাশরাফি খেলছে। কিন্তু না খেলার বিষয়টাকেও বড় করে দেখানো হয়েছে। এ প্রসঙ্গে মাশরাফি বিন মোর্ত্তজা বলেন, ‘সবাই জানেন। ওইখানে ২ তলায় সিদ্ধান্ত হয়েছে। এইটাকে বড় করা হয়েছে। জানি না কী কাজে বড় করা হয়েছে। তবে হ্যা, ক্যাপ্টেনের জায়গা থেকে যদি বলেন, তাহলে ক্যাপ্টেন হিসেবে আমি একটা দুর্বল মানসিকতার পরিচয় দিয়েছিলাম সকালে। একজন ক্যাপ্টেন হিসেবে টিম সেমিফাইনালে উঠতে পারছে না যে আমি শেষ না করে আমি সরে আসতে চেয়েছিলাম, এটা একটা দুর্বল মানসিকতার পরিচয় দিয়েছিলাম। আমার ক্যাপ্টেন হিসেবে যে কয়েকটা ভুল সিদ্ধান্ত ছিল, তারমধ্যে ওই একটা।’

একই সময় প্রকাশিত আরেকটি টেলিভিশনের সাক্ষাৎকারে সাকিবকে নিয়েও কথা বলেন মাশরাফি। ক্রিকেটার অফিসিয়াল থেকে শুরু করে এইচপি চেয়ারম্যান নাঈমুর রহমান দুর্জয়ের অ্যাক্টিভিটিজ নিয়ে সাকিব যে প্রশ্ন তুলেছেন; সেটি তিনি কীভাবে দেখছেন জানতে চাইলে মাশরাফি বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয় না যে ও দুর্জয় ভাইকে অ্যাটাক্ট করে কথা বলছে। ও যেটা বলেছে, এইচপিতে কী হচ্ছে বা এইচপি থেকে যে খেলোয়ার আসছে বা ‘এ’ টিম নাই এই প্রক্রিয়াটির কথা বলেছে।’

এ ব্যাপারে মাশরাফির প্রশ্ন, এচপি টিমের কনফিডেনসিয়াল মিটিং হয়, সেই মিটিংয়ের তথ্য কারা বের করে বাইরে? তিনি যোগ করেন, ‘তার মানে কনফিডেনসিয়াল তথ্যগুলো আগে বের হয়ে আসে এবং খেলোয়ারগুলো দিনের পর দিন ইনসিকিউরিটি ফিল করছে। আমরাও যদি বিসিবিকে কিছু বলি সেটা বাইরে চলে আসবে আগে। তো বিসিবিতো ক্রিকেটারদের অভিভাবক। তো আমি মনে করি ওই জায়গাটাকে কন্ট্রোল করার জন্য পাপন ভাইকে স্ট্রিক্ট হতে হবে।’

বাংলাদেশ নিউজিল্যান্ডে খেলছে। ফেসবুকে সাকিব যে কথাগুলো বলেছে, তাতে পুরো ব্যাপারটাই ঘুরে গেছে। সাকিব ও বোর্ড ইস্যু মুখোমুখি। এ বিষয়টি এ কাম্য কিনা? উত্তরে ম্যাশ বলেন, ‘কারোরই কাম্য না। বিশেষ করে আমি কথা বলছি। আমার কোনো যায় আসে না। কারণ, আমি বিসিবির বেতনভুক্ত ক্রিকেটার না। সো আমার ওই স্বাধীনতা আছে, বিসিবিরও আছে। কিন্তু সাকিবতো কোড অব কন্ট্রাক্ট খেলোয়ার, বেতনভুক্ত খেলোয়ার। সেই প্রশ্নটা আসতে পারে। তো সাকিব কেন বলবে? এখন আসছে কেন? সেটি ফাইন্ড আউট করতে হবে। আসছে তো এই কারণে যে, একজন আরেকজনের প্রতি লুজিং রেসপেক্ট এবং খেলোয়াররা ওইটাই ভাবছে যে, আমাদের সিকিউরিটি দেওয়ার মতো কেউ নাই। কোনো সিরিজে আপনি ভালো খেলবেন, খারাপ খেলবেন এইভাবেই যাবে। আমরা যখন খারাপ খেলবো অবশ্যই আমাদের শাসন করবে পাঁচটা কথা বলবে বা যেটাই বলবে আমাদের ড্রেসিং রুম আছে বা একটা জায়গায় বলবে। তো এই জিনিসিটা এখানে বলে বাইরে যখন কথা হচ্ছে বা লিগ হচ্ছে সেই জিনিসটাকে খেলোয়াররা বলছে যে সামথিং রং। এই যে কমিউনিকেশন গ্যাপ বা খেলোয়ার বুঝতে পারছে আমাদের যে আস্থার যে সবোর্চ্চ জায়গা সেটাই নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে। এখান থেকে তথ্য বাইরে যাচ্ছে। আমার দ্বারা কোনো পারফরমেন্স খারাপ হয় বা এমন কোনো কাজ হয়ে যায় বা ভুলভাল হয়ে যায় তাহলে আমাকে সিকিউরিটি দেওয়ার মতো কেউ নেই।’

এর আগে এক সাক্ষাৎকারে নিজের ফিটনেস নিয়ে কথা বলেন মাশরাফি। জানান, বিগত ২০ বছরে তার একটা ফিটনেস টেস্ট ফেল ছিল না। তার ফিটনেস নিয়ে একটি ভুল তথ্য দেওয়া হয়। এ সময় বিসিবির দায়িত্বপ্রাপ্তরা ঠিক মতো অফিস করেন কিনা, সে ব্যাপারেও সন্দেহ পোষণ করেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close